শুক্রবার, ২৯ জুন, ২০১৮

নিজেদের প্রার্থী নিয়ে অনড় জামায়াত, ছাড় দেবে না বিএনপিকে

৩০ জুলাই ভোট হতে যাওয়া তিন সিটি করপোরেশনের মধ্যে সিলেট নিয়ে জোটের দুই শরিক বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
সিলেটে বিএনপি বর্তমান মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। জামায়াত তাদের দলের নেতা এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকে নিয়ে আগে থেকেই ভোটের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
বিএনপি প্রার্থী ঘোষণা করলেও জামায়াত ভোটে অংশ নিতে মরিয়া। দলের একজন নেতা জানান, তারা শেষ নির্বাচনী মাঠ ছাড়বেন না। সেখানে উন্মুক্ত লড়াই হবে।
সিলেট সিটি করপোরেশনে মেয়র পদে বিএনপির কাছে ছাড়ের দাবি আগেই জানিয়ে রেখেছিল জামায়াত। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের স্থগিত নির্বাচনে সেলিম উদ্দিন এবং গাজীপুর সিটি করপোরেশনে এস এম সানাউল্লাহকে প্রার্থী করার পেছনে জামায়াতের মূল উদ্দেশ্য ছিল সিলেট নিয়ে দর কষাকষি।
গাজীপুরে সানাউল্লাহ সরে দাঁড়ানোর আগেই জামায়াত বিএনপির কাছে সিলেটে ছাড়ের শর্ত দিয়ে রেখেছিল।
রাজনৈতিক দল হিসেবে নিবন্ধন হারানো স্বাধীনতাবিরোধী দলটির দলীয় প্রতীকে ভোট করার কোনো সুযোগ নেই। তবে জোটের শরিক হিসেবে নিবন্ধিত দলের প্রতীক ব্যবহার করতে পারবে তারা ওই দলের অনুমতি সাপেক্ষে। আবার ২০০৯ সাল থেকে বিভিন্ন স্থানীয় নির্বাচনে স্বতন্ত্র হিসেবেও ভোটে অংশ নিচ্ছেন দলের নেতারা।
সিলেটে জামায়াত নেতা এহসানুল মাহবুব জুবায়ের মেয়র পদে নির্বাচন করতে গত কয়েক মাস ধরেই সিলেট চষে বেড়াচ্ছেন।

এর মধ্যে গত ২৪ জুন রাজশাহীতে বর্তমান মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল এবং বরিশালে সাবেক মেয়র মজিবর রহমান সরোয়ারকে মেয়র পদে প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিএনপি। কিন্তু সেদিন সিলেটের প্রার্থী ঘোষণা দেয়া হয়নি।
সেদিন বিএনপির সিলেটে প্রার্থী না দেয়ায় সেখানে জামায়াতকে ছাড় দেয়া হচ্ছে কি না, এই প্রশ্ন দেখা দেয়। তবে তিন দিনের মাথায় বুধবার আরিফুলকে প্রার্থী ঘোষণা দেয় বিএনপি।
তবে আরিফুলকে মানতে চাইছে না জামায়াত। তাদের নেতা জুবায়ের নির্বাচন করবেন- এই সিদ্ধান্তে অটল দলটি।
জামায়াতের নায়েবে আমির মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘সিলেটে আমরা মেয়র পদে প্রার্থী দেব। এবং শেষ পর্যন্ত থাকব। কোনো কমপ্রোমাইজ হবে না। এটাই আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত।’
বেলা তিনটার দিকে নয়াপল্টনে সংবাদ সম্মেলনে আরিফুলকে সিলেটের প্রার্থী ঘোষণা করেন বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী। ঘণ্টাখানেক পর গুলশানে চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে জোট নেতাদের সঙ্গে সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল সিটি নির্বাচন নিয়ে বৈঠক করেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
জামায়াত ছাড়াও বিএনপির আরেক জোটসঙ্গী খেলাফত মজলিসও সিলেটে মেয়র পদে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তাদের দলের মহানগর শাখার সাধারণ সম্পাদক একেএম আব্দুল্লাহ আল মামুনকে ভোট লড়বেন বলে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
ফখরুলের সঙ্গে বৈঠকে জামায়াত এবং খেলাফত মজলিসের নেতারাও ছিলেন। তবে তাদের প্রার্থী দেয়ার বিষয়ে তেমন কোনো আলোচনা হয়নি।
জোট নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের আগে জামায়াতের প্রার্থী ঘোষণা দিয়ে অন্য শরিকদের মধ্যে অস্বস্তি আছে। বিএনপির বাইরে প্রার্থী না দেয়ার ব্যাপারে দুই শরিক দলকে অন্যরা অনুরোধও করেছেন।
এলডিপি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব শাহাদাত হোসেন সেলিম বলেন, ‘তিন সিটি নির্বাচনে ধানের শীষের প্রার্থী জোটের প্রার্থী। আমরা জামায়াত ও খেলাফত মজলিসকে প্রতি অনুরোধ করেছি জোটের স্বার্থে নিজেদের প্রার্থী না দেয়ার জন্য।’
বাংলাদেশ ন্যাপ চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি বলেছেন, ‘বিনা চ্যালেঞ্জে কোন নির্বাচন ছাড় দেয়া উচিত হবে না। প্রমাণ করতে করতে হবে নৌকার বিপরীতে ধানের শীষই হচ্ছে জনগণের প্রতীক।’
বৈঠকে জামায়াতের প্রতিনিধি ছিলেন কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য আব্দুল হালিম। তবে কিছুক্ষণ পরই বের হয়ে যান তিনি।
হালিম বলেন, সিলেটে মেয়র প্রার্থী দেওয়ার দাবি বিএনপি মহাসচিবকে জানিয়েছি। দেখি তারা কী করেন।
জামায়াত নেতা মিয়া গোলাম পরওয়ার এ প্রসঙ্গে বলেন, আমরা ১২টা মেয়রের মধ্যে একটা মেয়র চেয়েছি। সিলেট আমাদের প্রাপ্য। আমরা অপেক্ষায় ছিলাম বিএনপির স্থায়ী কমিটি বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদের জানাবেন। কিন্তু তারা সেটা না করে প্রার্থী ঘোষণা করেছেন। এটা তাদের প্রার্থ্।ী ২০ দলের না।
কারণ যদি ২০দলের হত তাহলে সবার মতামতে হতো। এখানে একদলও যদি বাদ থাকে থাকলে তো ১৯দলের সিদ্ধান্ত হলো।
তাহলে কি বিএনপিকে আপনারা চ্যালেঞ্জ করছেন?- এমন প্রশ্নে পরওয়ার বলেন, তাদেরও প্রার্থী থাকবে আমাদেরও প্রার্থী থাকবে। এটা আমাদের দলীয় সিদ্ধান্ত।
গাজীপুরের মতো সিলেটেও শেষ মুহূর্তে সরে যাবেন কি না-জানতে চাইলে জামায়াত নেতা বলেন, ‘কোনো ছাড় নেই। আমরা তাদের বলে দিয়েছি যেহেতু আপনারাও ছাড়লেন না তাহলে আমাদের প্রার্থীও থাকবে আপনাদের প্রার্থীও থাকবে। ওপেন নির্বাচন হবে।
এমনটা জোটের মধ্যে দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ কি না- এমন প্রশ্নে পরওয়ার বলেন, ‘না এটা কোনো দ্বন্দ্বও না, টানাপড়েনও না। আর জোটের মূল বিষয়টি কিন্তু জাতীয় নির্বাচন কেন্দ্রীক। স্থানীয় নির্বাচনের উদ্দেশে আমাদের জোট। এখন কখনো কখনো দেখা যায় স্থানীয়ভাবে অনেক সময় বিএনপির সঙ্গে আমাদের স্থানীয় নেতারা সমঝোতা করে ফেলেন। সেটা হয়তো আমরা জানিও না।’
জামায়াত কবে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থী ঘোষণা করবে- জানতে চাইলে জবাব আসে, ‘এহসানুল মাহবুব জুবায়ের আমাদের সেখানের প্রার্থী। আর তার তো প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণার প্রয়োজন নেই। কারণ তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। তারপরও মনোনয়ন নেয়ার পর দেখা যাক, যদি প্রয়োজন হয় তখন আমরা ঘোষণা করব।’
বিএনপি-জামায়াতের শরিক দল এলডিপির নেতা শাহাদাত হোসেন সেলিম অবশ্য জোটের বৈঠক ছাড়া বিএনপির প্রার্থী ঘোষণাকে অশোভন, ও বিব্রতকর বলছেন। তিনি বলেন, ‘বৈঠক শেষে জোটের প্রার্থী ঘোষণা করা উচিত ছিল। সেটা না করে আগ বাড়িয়ে সবসময় এমন সংবাদ সম্মেলন করার জন্য বিএনপিকে ব্যাকফুটে যেতে হয়।