মঙ্গলবার, ৫ জুন, ২০১৮

৫৬ কোটি টাকায় আধুনিকায়ন হচ্ছে সিলেট বেতার

সত্তর-আশির দশকে বেতারই ছিলো এদেশের মানুষের বিনোদনের প্রধান মাধ্যম। তখন ঘরে ঘরে শুভা পেতো এই যন্ত্র । বর্তমান স্যাটেলাইটের যুগে এসে বেতারের কদর কমতে থাকে। আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে বলতে গেলে প্রায় বিতাড়িত এই মাধ্যম। এখন ঘরে রেডিও মানে শো’কেছের শোভা বর্ধন। কিন্তু তার পরও বেতারের জনপ্রিয়তা টিকে আছে কোন কোন অঞ্চলে। আর গাড়ি বা মোবাইলে বেতার বাজছে কখনো ফ্যাশনের অনুষঙ্গ হয়ে কখনোবা দিক নির্দেশক হিসাবে। আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বেতার এখনও টিকে যথেষ্ট দাপট নিয়েই।খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা সিলেট বেতারেও লাগছে আধুনিকতার ছোঁয়া। রাষ্ট্রীয় এ সম্প্রচার মাধ্যমের সার্বিক উন্নয়নে ৫৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন সরকার। সম্প্রতি একনেকে এই প্রকল্পটি পাশ হয়েছে। এ সংবাদে কর্মকর্তাসহ সিলেট বেতারের সাথে সংশ্লিষ্ট শিল্পী ও কলা-কুশলীদের মধ্যে আনন্দের জোয়ার বইতে শুরু করেছে। তাদের প্রত্যাশা, এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে সিলেট বেতারের সোনালী দিন আবার ফিরে আসবে।

অবশ্য শংকায়ও আছেন কেউ কেউ। জনগনের কোটি কোটি টাকা ব্যায় করে বেতার কেন্দ্রের উন্নয়ন হলেও আগের সেই জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধার সম্ভব হবেতো? এমন প্রশ্নও ঘুরপাক খেতে শুরু করেছে সংশ্লিষ্ট মহলে।
একসময় সিলেট বেতার ছিল খুব জনপ্রিয় একটি প্রচার মাধ্যম। তবে দিনবদলের পালায় আধুনিক অন্যান্য প্রচার মাধ্যমের কারণে দিনে দিনে শুধু সিলেট নয়, দেশের অন্যান্য বেতার কেন্দ্রগুলোর জনপ্রিয়তাও দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। বেতার কর্মকর্তাদের দুরদর্শিতার অভাবের সাথে আধুনিক সম্প্রচার যন্ত্রপাতির সংকটে সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা দিন দিন কঠিন থেকে আরও কঠিন হয়ে পড়ে। প্রচারিত অনুষ্ঠানের মানও তেমন একটা ভালো ছিলনা। অনেক সময় অনাকাংখিত শব্দের কারণে শ্রোতারা অনুষ্ঠান বুঝতে পারেন না।
সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার অনেক পুরানো হলেও সিলেট বেতারের সার্বিক কার্যক্রম এখনো চলছে এনালগ পদ্ধতিতেই। এ অবস্থা পরিবর্তনের জন্যই সরকারের এই উদ্যোগ।
সিলেট বেতারের সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি নির্ভরশীল সূত্রে জানা গেছে, এই প্রকল্পের আওতায় রেকর্ডিংয়ের মান উন্নত করার জন্য রেকর্ডিং স্টুডিওর আধুনিকায়ন করা হবে। স্থাপন করা হবে আরও উন্নত মেশানারিজ। তরঙ্গ প্রেরণ কেন্দ্রটিও সংস্কারসহ ডিজিটালাইজেশন করা হবে।
বর্তমানে সিলেট বেতারের নিজস্ব কোন অডিটোরিয়াম নেই। এর অভাব পুরণ করা হয় বাইরের অডিটোরিয়াম ভাড়া করে। এই প্রকল্পের আওতায় ১৫০ আসন বিশিষ্ট একটি আধুনিক অডিটোরিয়াম স্থাপন করা হবে। এতে বেতার সমৃদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি অনেক টাকাও সাশ্রয় হবে। একটি ৪তলা বিশিষ্ট ডর্মিটরিও স্থাপন করা হবে।
বর্তমান পুলিশ ব্যারাকটি সংস্কার জরুরী বহুদিন থেকে। এ প্রকল্পের আওতায় তাও বাস্তবায়ন করা হবে। সংস্কার করা হবে গার্ড রুমও। বর্তমান প্রচার কেন্দ্রের সীমানা প্রাচীর নির্মাণের পাশাপাশি মোটর সাইকেল ও বাইসাইকেল স্ট্যান্ড স্থাপন করা হবে। একটি উন্নতমানের জেনারেটারের অভাব দীর্ঘদিনের। এবার সেই অভাবটি পুরণ করা হবে। ক্রয় করা হবে ১শ’ কেবিএ জেনারেটর। টিলাগড় এলাকায় সিলেট বেতারের পুরানো কেন্দ্রটি বহু বছর থেকে বলতে গেলে প্রায় অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। এই প্রকল্পের আওতায় ঐ কেন্দ্রটির সার্বিক নিরাপত্তার বিষয়টিও আরো উন্নত করতে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করা হতে পারে। আর মীরের ময়দান কেন্দ্রেটি আরও সুন্দর ও আকর্ষনীয় করার কাজ ও হবে।
সিলেট বেতারের আঞ্চলিক পরিচালক ফখরুল ইসলাম বেতারের উন্নয়ন প্রকল্প সম্পর্কে বলেন, সরকারের এই বরাদ্দে সিলেট বেতার আধনিকায়নের কাজ শেষ হলে অনুষ্ঠানাদির মান আরও বাড়বে। এটা সবার জন্য, সিলেটের সর্বস্তরের জনগন, শিল্পী ও কলাকুশলীদের জন্য এটি খুবই আনন্দের একটি সংবাদ। তিনি বেতারে সিলেটবাসীর আশা আকাংখার প্রতিফলন ঘটবে বলে মত প্রকাশ করেন।
এই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলেও বেতারের জনপ্রিয়তা কতটা বৃদ্ধি পাবে তা নিয়ে কিন্তু সন্দিহান অনেকেই। বেতারের সাথে সংশ্লিষ্ট নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্রের মতে, আগে খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিল, বেতারের সেরকম অনেক প্রোগ্রামই কিন্তু এখন বন্ধ। সেগুলো আবার সম্প্রচার করা হবে কি-না এটিও পরিস্কার নয়। কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে ডিজিটাল বা আধুনিক বেতারকেন্দ্র যদি জনগনের পছন্দের অনুষ্ঠানাদি প্রচার না হয়, তাহলে আগের সোনালি দিনে ফিরবে কি করে? আধুনিক অন্যান্য গণমাধ্যমের সাথে পাল্লা দিতে হলে বেতারকে আরও উন্নত ও জনগনের আগ্রহ আছে তেমন অনুষ্ঠান নির্মান ও প্রচার করতে হবে। এক্ষেত্রে গবেষণা ও উদ্ভাবনী মনমানসিকতা সম্পন্ন কর্মকর্তা খুবই প্রয়োজন। মান্দাতা আমলের চিন্তাধারা পরিবর্তন না করে কোটি কোটি টাকা খরচ করে বেতারকেন্দ্র আধুনিকায়ন করে তেমন লাভ হবেনা। বিষয়টি সরকার, বেতার কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে বুঝতে হবে এবং সে অনুযায়ী কাজও করতে হবে।
সিলেট বেতারের যাত্রা ১৯৫৮ সালে। সেসময় নগরীর টিলাগড়ে দু’টি ষ্টুডিও সম্পন্ন ট্রান্সমিটার ভবনের নির্মাণ কাজ শুর হয়। দুই কিলোওয়াট শক্তির ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে ১৯৬১ সালের ১লা সেপ্টেম্বর প্রচার হয় প্রথম অনুষ্ঠান। তখন ছিল শুধু রিলে স্টেশন। ১৯৬৭ সালের ২৭ অক্টোবর থেকে নিজস্ব অনুষ্ঠান প্রচার শুরু করে বেতার। প্রথম কয়েক মাস শুধু সঙ্গীত প্রচারিত হতো। ১৯৬৮ এর জুলাই থেকে কথিকা ও নাটক যুক্ত হয়। পূর্ণাঙ্গ আঞ্চলিক কেন্দ্র হিসেবে সিলেট বেতার ১৯৭০ খৃষ্টাব্দে যাত্রা শুরু করে। বেতারের কার্যক্রম ও চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সিলেট বেতারে কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। তাই ১৯৭১ এর ২০ জানুয়ারি টিলাগড় থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পশ্চিম-দক্ষিণ দিকে মিরের ময়দানে ১৫ কক্ষ বিশিষ্ট একটি বাড়িতে দাপ্তরিক কাজ শুরু হয়।
১৯৭২ সালে এখানেই অস্থায়ী একটি রেকর্ডিং ষ্টুডিও নির্মাণ করা হয়। ১৯৭৮-৭৯ অর্থ বছরে সিলেট কেন্দ্রের পুর্ণাঙ্গ স্টুডিও নির্মাণে উল্লেখযোগ্য প্রকল্প গৃহীত হয়। স্টুডিওর সাজ-সরঞ্জামের অধিকাংশ অস্ট্রেলিয়া সরকারের অনুদানে পাওয়া যায়।
এ প্রকল্পের অধিনে নির্মিত হয় চারটি স্টুডিও, নিয়ন্ত্রন কক্ষ এবং ঘোষণা প্রচারের জন্য বুথ ও রেকর্ডিং এডিটিং কক্ষ। স্থাপন করা হয় ২৫ কিলোওয়াট শক্তি জেনারেটর। পুরনো ভবনের পাশেই ২.৬৭ একর জমির উপর ৪৫ কক্ষ বিশিষ্ট তিন তলা ভবনও নির্মিত হয়। ১৯৮০ সালের ০৮ মার্চ ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। সিলেট কেন্দ্রের প্রক্ষেপন যন্ত্রের ক্ষমতা দুই কিলোওয়াট থেকে বাড়িয়ে ১৯৭৮ সালে ২২ নভেম্বর বিশ কিলোওয়াটে উন্নীত করা হয়। অনুষ্ঠান প্রচারের ক্ষেত্রে সিলেট বেতারের অগ্রগতি আসে সেসময়। দুটি অধিবেশনে মধ্যম তরঙ্গ ও এফ এম. তরঙ্গে দৈনিক ২৩ ঘন্টা অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছে। ২০০৭ সাল থেকে এক কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ১০৫.০ মেগাহার্টস তরঙ্গের এফ এম ট্রান্সমিটারের মাধ্যমে অত্র কেন্দ্রের এফ এম স¤প্রচার শুরু হয়। ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে আরেকটি ১০(দশ) কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৮৮.৮ মেগাহার্টস তরঙ্গের এফ এম ট্রান্সমিটার স্থাপন করা হয় এবং এর মাধ্যমে অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু হয়।
২০১৩ সালের জুন মাসে পাঁচ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৯০.০ মেগাহার্টস তরঙ্গের এফ এম ট্রান্সমিটার স্থাপন করা হয় এবং এর মাধ্যমে অনুষ্ঠান সম্প্রচার শুরু হয়। বর্তমানে মধ্যম তরঙ্গের পাশাপাশি তিনটি এফ এম তরঙ্গে বিভিন্ন অনুষ্ঠান প্রচারিত হচ্ছে ।
অনুষ্ঠান প্রচারকালীন শ্রোতারা মোবাইল ফোনে এসএমএস এবং ফোন-ইন অনুষ্ঠানে ফোনের মাধ্যমে এর মাধ্যমে অংশ নেন। সংবাদ বুলেটিন ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি নারী ও শিশু উন্নয়ন, কৃষি, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকলপনা, শিক্ষা ও তথ্য প্রযুক্তি, উন্নয়নমূলক এবং জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রচারিত এসব অনুষ্ঠানমালা সিলেটে অঞ্চলে অত্যন্ত জনপ্রিয়।