রবিবার, ১৭ জুন, ২০১৮

মনু নদীর ভাঙন, মৌলভীবাজার শহরের একাংশ প্লাবিত

বন্যায় মৌলভীবাজারের শহরতলীর বারইকোনা এলাকায় মনু নদীর ভাঙনে মৌলভীবাজার শহর ও শহরতলীর একাংশ প্লাবিত হয়েছে। শনিবার (১৬ জুন) দিবাগত রাত ৩টার দিকে শহরতলীর উপজেলা বারইকোনা এলাকায় (উপজেলা কার্যালয়ের পেছন এলাকা) নতুন করে মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে পানি আশপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে মৌলভীবাজারের সঙ্গে সিলেটের সব ধরনের যান চলাচল বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
বারইকোনা ভাঙন দিয়ে পানি প্রবেশ করে শহরতলীর বড়হাট এলাকা প্লাবিত হয়ে ঢাকা সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কের কুসুমবাগ এলাকার রহমান ফিলিং স্টেশন ও এসআর প্লাজা হয়ে সেন্ট্রাল রোডের দিকে পানি ঢুকে পড়েছে ।




প্লাবিত হয়েছে পৌরসভার বরহাট ছাড়াও কুসুমবাগ, বড়কাপন ও যোগীডহর এবং সদর উপজেলার হিলালপুর ও শেখেরগাঁও।
এদিকে, শনিবার থেকে সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় তৎপর রয়েছেন। তবে আতঙ্কে বাসিন্দারা ছুটোছুটি করছেন মালামাল নিয়ে। পুরো এলাকাজুড়ে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

রবিবার সকাল থেকে মনু নদীর পানি শহরের চাদঁনীঘাট কাছে বিপদ সীমার ১৫৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। শনিবার রাতে ছিল বিপদসীমার ১৮০ সেন্টিমিটার ওপরে।
জানা যায়, মনু ও ধলাই নদীর এ পর্যন্ত ২২টি স্থানে প্রতিরক্ষা বাঁধ ভেঙে বন্যার পানি প্রবেশ করে কুলাউড়া, কমলগঞ্জ, রাজনগর ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত করেছে।
বুধবার (১৩ জুন) সকাল থেকে তলিয়ে গেছে এসব বাড়িঘরসহ রাস্তাঘাট। পানিবন্দি রয়েছেন জেলায় দুই লাখ মানুষ। জেলা সদরের সঙ্গে উপজেলা সদরের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। গত ৫ দিনে জেলার বিভিন্ন স্থানে বন্যার পানির তোড়ে ভেসে গিয়ে মোট ৫ জন মারা গেছে।

সেনাবাহিনীর মেজর মোহাইমিন বিল্লার নেতৃত্বে ২১ ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যাটালিয়ন সিলেট সেক্টরের ৭০ সদস্যের একটি টিম কাজ করে যাচ্ছেন।
শনিবার সকাল থেকে সেনাবাহিনীর দলটি মনুনদীর শহর প্রতিরক্ষা বাঁধ রক্ষায় বালিভর্তি বস্তা ফেলে চেষ্টা চালাচ্ছেন। বন্যায় তলিয়ে যাওয়া এলাকায় আটকা পড়া মানুষ উদ্ধারে কুলাউড়া, কমলগঞ্জ ও রাজনগরে সেনাবাহিনী কাজ করছে।

পাশাপাশি শহরের বাসা বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালামাল নিরাপদ স্থানে অনেকেই সরিয়ে নিচ্ছেন। অনেকেই নীচতলা ছেড়ে আত্মীয় স্বজনের দোতালা বাড়িতে আগে থেকেই আশ্রয় নিয়েছেন। প্রাইভেট কারসহ ব্যক্তিগত গাড়ি উঁচু স্থানে রেখেছেন।

জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম বলেন, জেলার ৩টি উপজেলায় সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। এ পর্যন্ত জেলায় ৩৪৩ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। নগদ ৫ লাখ টাকা বন্যা আক্রান্ত এলাকায় বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া আরও ৫০০ মেট্রিক টন চাল ও নগদ টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।

মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র মো. ফজলুর রহমান বলেন, গত ৩ দিন থেকে বাঁধ রক্ষায় আমিসহ পৌরসভার কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা কাজ করে যাচ্ছি। ১৯৮৪ সালে শহরে ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল, ওই সময়ের নদীর পানির উচ্চতার চেয়ে দুই থেকে আড়াই ফুট নদীতে পানি বেশি হয়েছে। বন্যায় যানমালের ব্যাপক ক্ষতিসহ হতাহতের ঘটনা ঘটেছিল। সে দিনের ঘটনা পৌরবাসী আজও ভুলতে পারেননি। সেনাবাহিনী মনু নদীর শহর প্রতিরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে। পাশাপাশি জেলা প্রশাসক মো. তোফায়েল ইসলাম, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহজালাল ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রণেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী সার্বক্ষণিক শহর প্রতিরক্ষা বাঁধের তদারকি করছেন।

মৌলভীবাজার-৪ আসনের সংসদ সদস্য সাবেক চিফ হুইপ ও প্রতিশ্রুতি সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. আব্দুস শহীদ এমপি বলেন, ধলাই ও মনু নদীর প্রতিরক্ষা বাঁধ রক্ষায় সেনাবাহিনীর পাশাপাশি সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে। আমি নিজেও কমলগঞ্জ উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকায় রাতদিন বন্যার্তদের মধ্যে ত্রাণ বিতরণ করে যাচ্ছি। পাশাপাশি বন্যার্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি।

মৌলভীবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রণেন্দ্র শংকর চক্রবর্তী বলেন, আজ রবিবার মনু ও ধলাই নদীর পানি কমে আসছে। রাতেই সেনাবাহিনীসহ আমরা ঘটনাস্থলে ছিলাম। বড়হাট বারইকোনা এলাকায় মনুনদীর প্রতিরক্ষা বাঁধের প্রায় ৪০ মিটার ভেঙে শহরের একাংশ বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানি আপাতত শহরের এম সাইফুর রহমান সড়ক (সেন্ট্রাল রোড) পুরাতন হাসপাতাল সড়কের এর দিকে প্রবেশ করার সম্ভাবনা নেই। আমরাতো আছি তার পাশাপাশি সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস প্রশাসনের জনবলসহ সাধারণ লোকজন বাঁধ রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছেন।