শুক্রবার, ১৮ মে, ২০১৮

ইফতারি,আম-কাঠালী কে না বলুন

মেয়ের জামাইর বাড়ি ইফতার, আম কাঠাল পাঠানো সিলেট সহ অনেক জায়গারই একটা রেওয়াজ।
একটু ভাবতে জানলে, বিবেক থাকলে বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে এটা একটা জঘন্য রুসুম (কু-প্রথা) এবং জুলুম।একটি মেয়ে বিয়ে দেওয়ার সময় বাবাকে যৌতুকের লাখ টাকার সামগ্রী সহ বরযাত্রা খাওয়াতে হয় লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করে, যার প্রত্যেকটা ব্যাপার শরিয়ত বহির্ভূত এবং মেয়ের বাবার উপর 'সামাজিক' অত্যাচার।সমাজের ছোবল এখানে শেষ হলে তবু মেনে নেওয়া যেতো। কিন্তু না-
এর পর রমজানে তাদের ইফতার দিতে হয় বর পক্ষের চৌদ্দ গুষ্টি কে খাওয়ানোর জন্য।

জৈষ্ঠে আম কাঠাল দিতে হয় আবারো বর পক্ষের চৌদ্দ গুষ্টির জন্য।
সবই সমাজ কে খুশী করতে।

একেকজন বরের পরিবারের কাছে প্রশ্ন- কোথায় পেয়েছেন এসব?
কে দিয়েছে অধিকার জুলুম করার?

সামাজিক দ্বীনদারদের উত্তর আমি জানি...
তারা বলে-
মেয়ে পক্ষ খুশী হয়ে দেয়!

জেনে রাখুন- এরা মিথ্যাবাদী, চরম মিথ্যাবাদী। মেয়ে পক্ষ অবশ্যই বাধ্য হয়ে দেয়।

শুনুন বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা বলি-

আমি দেখেছি এমন বাবা যিনি সন্তানের লেখাপড়ার পুরো টাকা দিতে পারেননা। টিউশন করে উনার সন্তান নিজের লেখাপড়ার খরচ চালায়।
ধার দেনা করে তিনি মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন।
বিয়ের পরের মাসে আমি এই বাবাকেই ইফতার দিতে দেখেছি ৪০হাজার টাকা আবারো ধার করে।
সাহস থাকলে বুকে হাত দিয়ে বলুন এমন আর্থিক অবস্থার একজন মানুষ খুশি হয়ে ৪০হাজার টাকা ধার করে ইফতারি দিয়েছে!!!

স্কুল টিচার- ২০ হাজার টাকা বেতন। মেয়ে বিয়ে দিয়েছেন ছোটবেলা থেকে জমানো টাকা দিয়ে। জানতেন, মেয়ে বিয়ে দিতে টাকা লাগে। মেয়ে সন্তান অভিশাপ (নাউজুবিল্লাহ)
এমন একজন স্কুল টিচার ৩০ হাজার টাকা দিয়ে ইফতারি দেন খুশী হয়ে?
অবাক হই ভেবে- এতো মিথ্যাচার এরা করে কিভাবে?

এক আংকেল কে নিজের চোখে দেখেছি ইফতারি দিতে টাকার জন্য হাত পাততে।
আসেন, আমার চোখে চোখ রেখে বলেন উনি খুশি হয়ে হাত পেতেছিলেন!!!

উচ্চমধ্যবিত্ত একটা পরিবার, যার কর্তার আয় মাসে লাখের মতো- উনার জন্য ও ৫০ হাজার টাকা দিয়ে ইফতারি দেওয়া অতো সহজ না। অনেক পেরেশানি, অনেক।
ভাবুন, দরিদ্র পরিবার গুলোর অবস্থা!
তাদের এসব ভাবার সময় নেই, না? 

বর্বর। এরা বর্বর। বর্বর এদের নীতি। বর্বর এ সামাজিকতা।

সামাজিক দ্বীনদারেরা বলে-
এটা সামাজিকতা। এগুলা সামাজিক অনুষ্টান। সমাজে চলতে হলে এগুলা মানতে হয়।

জ্বী হ্যাঁ জনাব। আপনে সমাজে চলুন। আর আপনার চলাতে কেউ নিচে পিষ্ট চলে চুপচাপ পিশে যান। তাকাতে হবেনা।
আজ সামাজিকতার দোহাই দিয়ে আপনি কেয়ার করছেননা একটি পরিবারের উপর এ বর্বরতা। দেখেও দেখেননা এসব অনাচার।
শুনেও চুপ। আপনার মেয়ের বিয়েতে আপনাকে দিতে হয়েছে তাই ছেলের বেলা আনছেন।

হয়তো এরা এতোটাই সামাজিক হয়ে গেছে যে কোনটা অত্যাচার আর কোনটা ইনসানিয়াত তা ভুলে গেছে।
আমার কথায় এরা থামবেও না। কিন্তু আপনি নিশ্চিত থাকুন, এরা সামাজিকতার নামে যা করছে তা জুলুম,জুলুম এবং জুলুম।

আর তাই এদের জন্য আল্লাহ তাআলার সতর্কবাণী---

‘সাবধান! অত্যাচারীদের ওপর আল্লাহর লানত।’ (সুরা আরাফ-৪৪)
-
অন্য আয়াতে বলা হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই জালিমরা চিরস্থায়ী আজাবে নিমজ্জিত থাকবে।’ (সুরা শুরা-৪২)
-
মহানবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘একজন মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই, সে তার ওপর জুলুম করতে পারে না এবং জালিমের হাতে সোপর্দও করতে পারে না।’ (বুখারি)
-
অন্য হাদিসে এসেছে ‘জুলুম কেয়ামতের দিন অন্ধকার হয়ে দেখা দেবে।’
-
আল্লাহ না করুন উনাদের বদদোয়া না লাগুক সেইসব পরিবারের উপর, যারা জোর করে এগুলা আদায় করে- 
‘মাজলুম বা অত্যাচারিতের বদদোয়াকে ভয় কর। কেননা তার বদদোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা নেই।’ (বুখারি)

সামাজিক দ্বীনদারদের মধ্যে এক শ্রেণি আছেন যারা বলেন যে, আমার টাকা আছে তাই দেই। এতে সমস্যা কি?
-
এতে আরো বড় সমস্যা। এদের মতো কিছু টাকাওয়ালারা এসব করেই বর্বর প্রথাগুলো চালু করেছে। আর প্রথাগত কারনেই গরীবরা দিতে বাধ্য হয়। 
তাহলে যদি এই টাকাওয়ালা দের জন্য এই প্রথা প্রচলিত রয়ে যায়, তবে কি তারা জালিমদের অন্তর্ভুক্ত না?
অবশ্যই অন্তর্ভুক্ত। অবশ্যই তারা জালিমের সাহায্যকারি।
-
অনেকে বলেন এটা মহব্বত। আর ইফতার করানো তো নেকী। সমস্যা কোথায়?

মহব্বতের নাম দিয়ে শয়তান এদের মাধ্যমে এ রুসুমকে চালু রাখার চেষ্টা করে।
যদি মহব্বতই হতো, তবে ছেলে পক্ষ কেনো মহব্বত দেখিয়ে পাঠায়না? কেবল মেয়ে পক্ষ কেনো পাঠাবে?
আর ইফতার খায়ানো নেকী, নেকীর নিয়তে হয়ে থাকলে এ ইফতার টা গরীব মিসকিনদের কেন খাওয়াননা? জামাইর আত্মীয় স্বজন পুরো বংশকে কেন খাওয়াতে হবে?
-চালাকি কম, ঠিক আছে? মানতে হবে। না মেনে পারেনা তারা, স্বীকার করে নিলেই হয়। নেকীর নামে ধোকার চেষ্টা কেনো?
-
আপনার মহব্বত এর মেয়ে, তার জন্য,জামাইর জন্য, বেয়াই-বেয়াইনের জন্য কিছু ইফতার হাতে করে নিয়ে যান। মেয়েকে নিয়ে খান। মহব্বত তো আলহামদুলিল্লাহ এটাই। 
গাছে আম কাঠাল ধরেছে, মহব্বত করে মেয়ের জন্য নিয়ে যান। এটা মহব্বত।
ট্রাক ভরে আম কাঠাল পাঠানো, ইফতার পাঠানো- এগুলা মহব্বত না। এগুলা রুসুম। যা আপনি পালন করে অন্যকে করতে উৎসাহ দিচ্ছেন। সমাজে একটা কুপ্রথা প্রচলিত রাখার গুনাহগার হচ্ছেন। যে প্রথার জন্য অত্যাচারিত হচ্ছেন হাজার হাজার মধ্যবিত্ত আর দরিদ্র বাবা আর ভাইয়েরা।
-
আর যেসব বাবারা বাধ্য হয়ে মেয়ের সুখের জন্য ধার দেনা করে রেওয়াজ গুলো মানতে বাধ্য হচ্ছেন, আল্লাহ তা'লা তাদের উপর রহম করুন। নিভৃত এ অত্যাচারের বিনিময়ে আল্লাহ পাক উনাদের গুনাহ মাফ করে দিন।
-
ইমানকে শক্ত করুন। এসব কুপ্রথা ভাঙার জন্য আপনি মুমিন হয়েছেন।
শ্বশুরকে বলুন, "আপনি এগুলো না দিলেও আপনার মেয়েকে আমি ভালোবাসবো, স্ত্রী-র যথাযথ মর্যাদা দিবো। ইফতারি দিতে হয় গরীব মিসকিন কে দিন। আমার আত্মীয় স্বজনকে আপনি কেনো খাওয়াবেন? এসব অপচয় দয়া করে করবেন না। আমাকে জুলুমকারীদের লাইনে দাঁড় করাবেন না।"
-
সত্যের পথ প্রদর্শক হোন। মিথ্যা নিয়ে আর কতোকাল বেঁচে রবো আমরা?

জুনেদুর রহমান
চেয়ারম্যান
ইউএসও সিলেট
সদস্য
বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থা