মঙ্গলবার, ১৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮

যাদের নিয়ে গর্ব করতে পারে বাংলাদেশ

সম্প্রতি তরুণদের নানা নেতিবাচক ঘটনায় সচেতন মহলে  অভিযোগ উঠেছে যে, এই তারুণ্য উচ্ছৃঙ্খল। কিন্তু এই প্রজন্মেরই কয়েকজন তরুণ তাদের সৃজনশীলতা, শৃঙ্খলা, মেধা-মনন ও পরিশ্রম দিয়ে দারুণ সব কাজ করছেন। তাদের নিয়ে গর্ব করে এই প্রজন্ম। গর্ব করার মতো এমনই কয়েকজন তরুণের কথা জানাচ্ছেন সৈয়দ তাওসিফ মোনাওয়ার।

করভী রাখসান্দ
বিত্তবান পরিবারের সন্তান করভী রাখসান্দ ঢাকা শহরের সবচেয়ে বড় বস্তিতে দরিদ্র শিশুদের জন্য গড়ে তুলেছেন ‘জাগো ফাউন্ডেশন’। তার বয়স যখন সবে কুড়ি পেরিয়েছে, তখন একদিন ঢাকায় ঘুরে বেড়ানোর সময় একদল পথশিশুর সঙ্গে দেখা হয়। ছোট্ট একটি মেয়ে পথশিশু তার হাত ধরে বলল তার থাকার কোনো জায়গা নেই, করভী তাকে বাড়িতে নিয়ে যাবেন কি না? সেদিন তিনি তা না পারলেও ঘটনাটি তাকে খুব যন্ত্রণা দিয়েছিল। এ থেকেই শুরু। রায়ের বাজার বস্তির একটি ঘরে ১৭ জন শিশুর জন্য ক্লাস খোলা হলো, গড়ে উঠল জাগো ফাউন্ডেশন। জাগো ফাউন্ডেশন এখন সুপরিচিত নাম। কেবল দরিদ্রদের ইংরেজি শিক্ষাই না, সুস্বাস্থ্য, প্রাথমিক চিকিত্সা, সেলাই ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানও পরিচালনা করছে। মাত্র চার বছরেই এই অগ্রগতি।
২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে অনূর্ধ্ব ৩৩ শীর্ষ ৯৯ প্রভাবশালী পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক নেতার পুরস্কার পান করভী। একই বছর কমনওয়েলথ ইয়ুথ পুরস্কারের জন্য মনোনীত হন। এছাড়াও আরো নানা পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।

ওসামা বিন নূর
গ্রামের মাদ্রাসায় পড়েছেন। শহরে এসে দাখিল ও আলিম পড়া শেষ করে বিডিএস কোর্সে ভর্তি হয়ে দন্তচিকিত্সার পাঠ নেন। যোগ দেন সেবামূলক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘ভলান্টিয়ার ফর বাংলাদেশ’-এ। সেখানে ঢাকা জেলার প্রেসিডেন্ট হন। মানিক নামের এক বন্ধুকে নিয়ে তরুণদের জন্য কাজ ও কাজের সুযোগ জানাতে ফেসবুকে ‘ইয়ুথ অপরচুনিটিজ’ নামে পেজ খোলেন। এই ফেসবুক পেজটি এখন প্রায় দু’শটি দেশের তরুণদেরকে বিভিন্ন স্কলারশিপ, কম্পিটিশন, ফেলোশিপ ইত্যাদি তথ্য জানাচ্ছে। ওয়েবসাইটে প্রতিদিন ভিজিটর গড়ে ২০ হাজার। দেশে রবি এবং গ্রামীণফোন ব্যবহারকারীরা ওয়েবসাইটটি বিনামূল্যে ব্যবহার করতে পারেন।

ওসামা বিন নূরের রয়েছে আরো বড় পরিকল্পনা। এ বছর ফোর্বসের এশিয়ার সামাজিক উদ্যোক্তা তালিকার শীর্ষ ৩০ জনের একজন মনোনীত হন তিনি। ২০১৬ সালে পেয়েছেন ‘দ্য কুইন্স ইয়াং লিডার্স’ অ্যাওয়ার্ড, সম্মাননা নিয়েছেন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের হাত থেকে।

আয়মান সাদিক
অনলাইন শিক্ষক হিসেবে জনপ্রিয় আয়মান সাদিক। পরিচিতি তার গড়া টেন মিনিটস স্কুল দিয়ে। অনলাইনে লাখ লাখ শিক্ষার্থী তার এই স্কুলের শিক্ষার্থী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ পড়াশোনার সময় বিভিন্ন বিষয়ে ইউটিউবের টিউটোরিয়াল দেখে সাহায্য নিতেন। তাছাড়া কোচিং সেন্টারে শিক্ষার্থীদের পড়াতেও ভালো লাগত তার। এমনও দেখেছেন, টাকার অভাবে অনেকে ভর্তি কোচিং করতে পারছে না। সেই খারাপ লাগা, আর পড়ানোর প্রতি ভালোলাগা থেকে আয়মান ভাবতেন, বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীদেরকে কীভাবে বিনা খরচে লেকচার দেওয়া যায়। এভাবেই শুরু টেন মিনিট্স স্কুলের। সারাদিন ক্লাস করে, টিউশনি করে রাতের বেলায় ভিডিও কনটেন্ট বানাতেন আয়মান। এখন পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি, এইচএসসিসহ বিসিএস পরীক্ষার্থীরাও টেন মিনিটস স্কুলের শিক্ষার্থী। অসংখ্য ভক্ত পাঠ নিচ্ছে তার অনলাইন লেকচার থেকে। এবার ব্রিটিশ রানির ‘ইয়াং লিডার্স’-এর স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। তার ঝুলিতে রয়েছে আরো অসংখ্য সম্মাননা ও পুরস্কার।

মাশাহেদ হাসান সীমান্ত
সীমান্তর বাড়ি সীমান্তের জেলা পঞ্চগড়ে। পড়েছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএতে। স্কুলে পড়ার সময় থেকে বিতর্ক ভালোবাসতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ইচ্ছার মাত্রা বাড়ল। ক্যাম্পাসে যোগ দিলেন জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি ডিবেট অর্গানাইজেশনে। দক্ষতা তো বাড়লোই, সাফল্যও পেতে শুরু করলেন একের পর এক। নিজের ইংরেজি দক্ষতার কারণে বিদেশে গিয়েও বিতর্কের বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন কয়েকবার। ২০১২ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত অক্সফোর্ড ইন্টারভার্সিটি ডিবেট চ্যাম্পিয়নশিপে বিচারক ছিলেন পরের বছর ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি ডিবেট চ্যাম্পিয়নশিপে। এশিয়া ডিবেট একাডেমির কর্মশালায় বিভিন্ন দেশের ২০ বিতার্কিকের মধ্যে হয়েছেন শ্রেষ্ঠ। সীমান্ত ভারত, চীন, মালয়েশিয়া, ব্রিটেনে গিয়ে বক্তৃতা দিয়েছেন। তিনি তার বক্তৃতায় হতাশাগ্রস্ত তরুণদেরকে অনুপ্রেরণা জোগান। গত চার বছরে ৭০টি মোটিভেশনাল সেশন করেছেন। এভাবেই মানুষকে ভালো কাজে অনুপ্রাণিত করে যাওয়াটাই নিজের লক্ষ্য বলে মনে করেন এই তরুণ।

মিজানুর রহমান কিরণ
ফোর্বস ম্যাগাজিনের ‘থার্টি আন্ডার থার্টি এশিয়া ২০১৭ :দ্য সোশ্যাল এন্টারপ্রেনারস মেকিং অ্যা বিগ ডিফারেন্স’ তালিকায় স্থান পেয়েছেন ২৯ বছরের তরুণ মিজানুর রহমান কিরণ। তিনি ফিজিক্যালি-চ্যালেঞ্জড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (পিডিএফ) প্রতিষ্ঠাতা। সংগঠনটি দেশের প্রতিবন্ধীদের উন্নয়নে কাজ করছে। প্রতিবন্ধীদের নানা সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের অধিকার নিয়েও কাজ করছে পিডিএফ। ২০০৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কিরণ পিডিএফ প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিবন্ধীরাও সমাজের অন্য আটদশজনের মতোই, এই সচেতনতা গড়ে তোলাই তাদের মূল লক্ষ্য। শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে নিয়ে সংগঠনটির পথচলা শুরু হলেও বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায় বিশটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যক্রম রয়েছে পিডিএফের। ২০০৯ সালের আগ পর্যন্ত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীরা অংশ নিতে পারত না। তাদের জন্য আন্দোলন করেন পিডিএফের সদস্যরা। কিরণ প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজ গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন।

সওগাত নাজবিন খান
গেল বছর ফোর্বসের তালিকায় উঠে আসা তরুণ উদ্যোক্তা সওগাত নাজবিন খান ‘পাইওনিয়ার ওম্যান’ ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত হয়েছেন। এসডিজির যুবদূত এই তরুণী প্রতিষ্ঠা করেছেন এইচএ ডিজিটাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। নাজবিন তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলায় পারিবারিক জমিতে এই বিদ্যালয় গড়ে তোলেন। সেখানে আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে গ্রামের দরিদ্র পরিবারের শিশুদেরকে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে অন্তত ছয়শ শিশুকে এভাবে সাহায্য করেছে এইচএ ডিজিটাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এই অনন্য উদ্যোগ ও প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার জন্য ২০১৬ সালে কমনওয়েলথ ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড পান। এছাড়া স্বল্পখরচে সৌরশক্তি দিয়ে সেচকাজের পদ্ধতি আবিষ্কার করে ২০১৫ সালে গ্রিন ট্যালেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান। সওগাত ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ থেকে ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অনার্স সম্পন্ন করেন। এরপর ভারতের একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি দূষণমুক্ত জ্বালানি (গ্রিন এনার্জি) বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। 

জাইবা তাহিয়া
জাইবার জন্ম ঢাকায়। ছোটবেলায় কানাডায় স্কুলে পড়াশোনা করেছেন। এরপর ঢাকায় ফিরে এসে কয়েকবছর থাকার পর ইংল্যান্ডে গিয়ে অপরাধ বিজ্ঞানে পড়াশোনা করেন। দেশে ফিরে এসে কিছু করার কথা মা-বাবাকে বলার পর শুরুতে তারা খুব অবাক হন, কিন্তু উত্সাহ দিয়ে বলেন—থেমে থেকো না। দেশে ফিরে পুলিশ স্টাফ কলেজে রিসার্চার হিসেবে কাজ করার পর ভাবলেন এবার নিজে কিছু করবেন। গড়লেন নিজের সংগঠন, ফিমেল এমপাওয়ার মুভমেন্ট বা সংক্ষেপে ফেম। গণমাধ্যমে নারী নির্যাতন, ধর্ষণের খবর প্রায়ই তার চোখে পড়ত, যা দেখে কষ্ট পেতেন। সমাধান ভাবতে গিয়ে  শুরু করলেন প্রজেক্ট ‘আত্মরক্ষা’। নারীদেরকে কারাতের মাধ্যমে আত্মরক্ষা শেখানো হয় এতে। সম্প্রতি ঘোষণা করা ব্রিটিশ রানির ২০১৮ সালের ‘ইয়াং লিডার্স’-এর তালিকায় স্থান পেয়েছেন তিনি, কিছুদিনের মধ্যেই পুরস্কার নেবেন রানির হাত থেকে। এই অর্জনের পরপরই আলোচনায় আসেন জাইবা। তিনি মনে করেন, নারীর ক্ষমতায়নে তরুণরাই বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারে।

কাজী সাবির
ক্রিকেট, ফুটবল আর বাস্কেটবলের মাঠে মেতে থাকতেন কাজী সাবির। খেলাধুলার প্রতি তার ভীষণ ভালোলাগা। মার্কিন দূতাবাসে চাকরিতে যোগ দেন। কিন্তু খেলার ভূত তখনো মাথায়। এক পর্যায়ে ভাবলেন, ভালোলাগার বিষয়টাকেই কর্মক্ষেত্রে বানিয়ে ফেললে কেমন হয়? চাকরি ছেড়ে চার বন্ধু মিলে শুরু করলেন ইম্যাগো স্পোর্টস এজেন্সি। চার বন্ধুর স্বপ্ন ছিল, খেলার সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে অর্থ উপার্জন করবেন। দেশের বেশ কয়েকজন সেরা খেলোয়ারদের এজেন্ট হওয়ার পাশাপাশি স্বনামধন্য ক্লাব এবং কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের স্পোর্টস পোর্টফোলিও জোগাড় করতে হয়। বিপিএল ও বিসিবির অফিসিয়াল প্লেয়ার্স ম্যানেজমেন্ট পার্টনার হওয়ার দায়িত্ব সাবিরদেরকে বিভিন্ন দেশের খেলোয়াড় ও স্পোর্টস এজেন্টদের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ করে দেয়। মাশরাফি, রিয়াদদের প্রতিনিধিত্ব করেছে ইম্যাগো। তারা মনে করেন, খেলায় সাফল্য একদিন বাংলাদেশকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যাবে, আর সেই গৌরবের অংশীদার হতে চান তারা। 
সূত্র:ইত্তেফাক