সোমবার, ১৫ জানুয়ারী, ২০১৮

বাংলাদেশে চলচিত্রে হিট ছবির আকাল,দেড় বছরে ৩০টি সিনেমা হলে তালা !

নিউজ ডেস্ক:ঢাকায় চলছে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব যেখানে ৬০টিরও বেশি দেশের দুশোর ওপরে সিনেমা দেখানো হচ্ছে। কিন্তু এই উৎসব যখন চলছে, ঠিক সে সময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্ররা প্রদর্শকরা আবারো অভিযোগ করেছেন, দেশে তৈরি চলচ্চিত্রের প্রতি দর্শকদের অনাগ্রহ তাদের ব্যবসাকে চরম অস্তিত্বের সঙ্কটে ফেলেছে।
তারা বলছেন ২০১৭ সালেই বাংলাদেশে মুক্তি পেয়েছে ৬২টি চলচ্চিত্র, কিন্তু দর্শক টানতে পেরেছে হাতে গোনা মাত্র কয়েকটি।
বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতি বলছে, দর্শকের অভাবে অব্যাহত লোকসানের জেরে গত দেড়-বছরের ৩০টির মত সিনেমা হল বন্ধ হয়ে গেছে দেশে।

অর্ধশত-বর্ষী ঐতিহ্যবাহী মধুমিতা সিনেমাহলের মালিক ইফতেখারউদ্দিন নওশাদ বিবিসিকে বলছেন, যেভাবে ভর্তুকি দিয়ে হল চালাতে হচ্ছে, ভবিষ্যতে আর কতদিন টিকিয়ে রাখা যাবে সেটি নিয়ে তিনি এখন সন্দিহান।

"চল্লিশ বছরে এমন সাফার করিনি। গত দশ বছরে যা করছি। এখন যে সিনেমাগুলো হচ্ছে তা প্রদর্শনের উপযোগী না। গত বছর মাত্র তিনটি ছবি ব্যবসা করেছে। ৫২ সপ্তাহের মধ্যে মাত্র তিনটি ছবি বাণিজ্যিক সাফল্য ফেলে তো আমাদের চলবে না।"

"আর্টিস্টরা যারা মারা গেছেন বা যারা অবসরে গেছেন সেই শূন্যতা পূরণ হয়নি ... আমরা এখন আইসিইউতে আটকে আছি"।

তিনি বলেন, ঢাকার ফিল্ম জগতের লোকজনকে এখন মেনে নিতে হবে যে তারা ব্যবসাসফল ছবি দিতে পারছেন না।
"আমরা চাচ্ছি ভারতীয় ছবি যেন সরকার এখন ছেড়ে দেয়। এই যে কিছুদিন আগে চালের স্বল্পতা দেখ গিয়েছিল। স্বল্পতা দেখা দিলেই কিন্তু বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়। তেমনিভাবে আমরাও চাচ্ছি যে, বছরে অন্তত ২০/২৫টা ছবি যেন সরকার যদি আনতে দেয়"।

তিনি বলেন, ছবিগুলো যদি একসাথে ভারতের সাথে মুক্তি দেয়া হয় তাহলে ছবিগুলো ব্যবসা করবে এবং হলগুলো বাঁচবে।

তা নাহলে, মি নওশাদ বলেন, হল ভেঙে ফেলার কথাই তাদের চিন্তা করতে হবে। "এর চেয়ে ভালো আমরা হল ভেঙে ওখানে যদি সুপার মার্কেট করি তাহলে আরও পয়সা পাবো"।

তিনি জানান, গত ছয়মাস ধরে তারা হলের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঠিকমত বেতন দিতে পারছেননা। ঢাকার বাইরের পরিস্থিতি আরও খারাপ বলে তিনি উল্লেখ করেন।

অথচ প্রযোজক সমিতির তথ্য, বাংলাদেশে ২০১৭ সালে ৬২ টি সিনেমা মুক্তি পেয়েছে। তারপরও হলগুলোর মালিকদের বক্তব্য এতটাই হতাশাজনক। কিন্তু এসব সিনেমা কেন দর্শকদের হলে যেতে আগ্রহী করতে পারছে না?

এ প্রসঙ্গে উঠে আসে সিনেমার নির্মাণ দুর্বলতা, কাহিনীর বৈচিত্রহীনতা, হলের মানসম্পন্ন পরিবেশের অভাবসহ নানা বিষয়।

কোনও কোনও দর্শক মনে করছেন, কিছুটা হলেও পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। অনেকের কথাতেই ঘুরেফিরে উঠে আসে মনপুরা, অজ্ঞাতনামা, ঢাকা অ্যাটাক ভুবন মাঝি সহ হাতে গোনা কয়েকটি সিনেমার কথা।

অনেকগুলো ব্যবসা সফল সিনেমার পরিচালক ও প্রযোজক সোহানুর রহমান সোহান বলছিলেন, "সিনেমা দেখানোর জন্য সিনেমা হল নেই। আর সিনেমা বানানোর জন্য প্রডিউসার নেই। কারণ সিনেমা পাইরেসি হয়ে যায়। এসব চিন্তা থেকেই মেইনলি যারা ছবি বানাতো, সিনেমা যারা ভালোবাসতো, ছবির প্রতি যাদের প্রেম ছিল সেখান থেকে তারা সরে গেছে"।

দেশের সিনেমার জন্যে একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে পরিচালক প্রযোজকরা মনে করছেন স্যাটেলাইট চ্যানেলে প্রচারিত ভারতীয় সিনেমাকে। আর সমালোচকরা বড় করে দেখছেন মানসম্পন্ন সিনেমার সংকট এবং বর্তমান প্রেক্ষাপটে হলে গিয়ে সিনেমা দেখার মানসিকতার অভাবকে।

চলচ্চিত্র সমালোচক অধ্যাপক জাকির হোসেন রাজু বলছিলেন, "একেতো বিশ্বমানের সিনেমা নির্মাণ করে দেখানো সেটার অনেক অভাব রয়েছে, অন্যদিকে সিনেমা দেখার বিকল্প অনেকগুলো এভিনিউ হয়েছে। শুধুমাত্র স্যাটেলাইটে স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো, গ্রামের দিকে এবং ঢাকার আশে-পাশে অনেকেই মোবাইলেও সিনেমা দেখছেন"।

তিনি বলেন নতুন অনেক নির্মাতারা আসছেন তবে তাদের মধ্যে অনেকেই একটি বা দুটি সিনেমার পরই হতাশ হয়ে মনোযোগী হচ্ছেন বিজ্ঞাপন নির্মাণের দিকে, কারণ সেটি লাভজনক।

বর্তমানে সিনেমায় কারিগরি প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়ছে, বাড়ছে বাজেটের আকারও। কিন্তু তারপরও আশি বা নব্বইর দশকের ছবিকে এখনো এগিয়ে রাখছেন মধ্যবয়সী দর্শকেরা অনেকেই। আর এই প্রজন্মের দর্শকেরা তাদের মান সম্পন্ন সিনেমা দেখার তৃষ্ণা মেটাচ্ছেন এই ধরনের ফিল্ম ফেস্টিভ্যালের আঙিনায় এসে। সূত্র: বিসিসি।