বুধবার, ৬ ডিসেম্বর, ২০১৭

রাজধানীতে ৯৭ শিক্ষকের বিরুদ্ধে মন্ত্রীপরিষদে দুদকের সুপারিশ

বিশেষ প্রতিবেদন:কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত রাজধানীর আট নামিদামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ৯৭ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক চূড়ান্ত সুপারিশ মন্ত্রিপরিষদে পাঠিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

অনুসন্ধানের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার প্রায় দুই মাস পর কমিশন থেকে ওই সুপারিশ রোববার মন্ত্রিপরিষদ সচিব বরাবর পাঠানো হয়েছে। দুদকের জনসংযোগ দপ্তর এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।

দুদক সচিব ড. শামসুল আরেফিন সই করা চিঠিতে পাঁচটি বিষয়ে সুপারিশ করা হয়েছে। চিঠির প্রথম দুই সুপারিশে এমপিওভুক্ত চারটি বিদ্যালয় ও চারটি সরকারি বিদ্যালয়ের ৯৭ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধ নীতিমালা, ২০১২ অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে।
এর মধ্যে এমপিওভুক্ত চারটি বিদ্যালয়ের ৭২ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নীতিমালা অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কমিটি সভাপতি ও পরিচালনা পর্ষদকে অনুরোধ করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি বিদ্যালয়ের ২৫ জন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নীতিমালা ও সরকারি কর্মচারী বিধিমালা, ১৯৮৫ অনুযায়ী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।

কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মতিঝিল শাখার ৩২ জন ও বনশ্রী শাখার চারজনসহ মোট ৩৬ জন, মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ২৪ জন, ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সাতজন, রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের পাঁচজন, মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের ১২ জন, মতিঝিল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের চারজন, খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন ও গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুলের আটজন শিক্ষকসহ ৯৭ জনের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা।

তবে দুদক টিমের সুপারিশে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ১৪ শিক্ষকের নাম থাকলেও চূড়ান্ত সুপারিশে তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।

শাস্তির বিষয়ে চিঠিতে আরো বলা হয়েছে, কোচিং বাণিজ্য রোধে এর সঙ্গে জড়িত শিক্ষকদেরকে সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী এক বিদ্যালয় হতে অন্য বিদ্যালয়ে, এক শাখা হতে অন্য শাখায়, দিবা শিফট হতে প্রভাতী শিফটে বা প্রভাতী শিফট হতে দিবা শিফটে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর বদলির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করা যেতে পারে। যারা একইসঙ্গে দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে বহাল থেকে কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত থেকে অনৈতিকভাবে অর্থ উপার্জন করেছেন তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কারণ এ জাতীয় আয়ে কোনো প্রকার ভ্যাট বা কর দেওয়া হয় না। ফলে এভাবে উপর্জিত আয় অনুপর্জিত আয়ে পরিণত হয়, যা সংবিধানের ২০ (২) অনুচ্ছেদের লঙ্ঘন। যেখানে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র এমন অবস্থাসৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে সাধারণ নীতি হিসাবে কোন ব্যক্তি অনুপার্জিত আয় ভোগ করিতে সমর্থ হইবেন না।’ এ ছাড়া কোচিং বন্ধে আইন প্রণয়নের কথা বলা হয়েছে সুপারিশে।

এ বিষয়ে দুদক সচিব ড. শামসুল আরেফিন বলেন, ‘দুদকের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয় থেকে অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর কমিশন তা যাচাই-বাছাই শেষে সুপারিশ চূড়ান্ত করেছে।’

এর আগে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহে অনুসন্ধান শেষে কোচিং বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত ১১১ শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণসহ এ পর্যায়ের চূড়ান্ত অনুসন্ধান প্রতিবেদন কমিশনে জমা দেয় দুদকের অনুসন্ধান টিম। অনুসন্ধান পর্যায়ে দুদক টিম বেশ কয়েকবার রাজধানীর বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কোচিং সেন্টারে অভিযান পরিচালনা করে।

অভিযুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি সুনির্দিষ্ট শাস্তির বিধান রেখে কোচিং বাণিজ্য বন্ধে আইন প্রণয়নের সুপারিশ করে কমিশনে প্রতিবেদন পেশ করেছে ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয় থেকে। আপাতত আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে কোনো ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়নি প্রতিবেদনে।

এ বিষয়ে দুদকের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক ও টিম প্রধান মোহাম্মদ ইব্রাহীম  বলেন, আমরা আমাদের সাধ্যমত পরিশ্রম দিয়ে অনুসন্ধান করে তথ্য-প্রমাণসহ প্রতিবেদন দুদকের প্রধান কার্যালয়ে জমা দিয়েছি। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নীতিমালা অনুযায়ী কোচিংয়ে জড়িত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে সরাসরি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব না হলেও কোচিংয়ে যুক্ত শিক্ষকদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে। এখন কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিবেন।

২০১২ সালের ২০ জুন কোচিং বাণিজ্য বন্ধ করতে নীতিমালা তৈরি করে প্রজ্ঞাপন জারি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। নীতিমালায় নিজ নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং অথবা প্রাইভেট পড়াতে নিষেধ করা হয়েছে। তবে কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে অন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ ১০ জন ছাত্রছাত্রীকে নিজ বাসায় পড়ানোর সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান প্রধানকে লিখিতভাবে ছাত্র-ছাত্রীর নাম ও রোল নম্বরসহ তালিকা জানাতে হবে। শুধু তাই নয়, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা ওই ১০ শিক্ষার্থীর মধ্যে নিজ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের একজনকে পড়ালেও তাকে অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হবে। কোচিং সেন্টারের নামে বাসা ভাড়া নেওয়ার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধের কথা বলা হয়েছে। এমনকি কোনো শিক্ষক বাণিজ্যিকভাবে গড়ে ওঠা কোচিং প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত হতে পারবেন না।

শাস্তির বিষয়ে নীতিমালায় বলা হয়েছে, সরকারি বা এমপিওভুক্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক কোচিং বাণিজ্যে জড়িত থাকলে সাময়িক বা চূড়ান্ত বরখাস্ত, এমপিওভুক্ত শিক্ষক হলে এমপিও স্থাগিত, বাতিল, বেতন-ভাতাদি স্থগিত, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি স্থগিত, বেতন এক ধাপ অবনমিতকরণ ইত্যাদি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।

অভিযুক্ত শিক্ষকদের তালিকা :
আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ : নিজাম উদ্দিন কামাল (ইংরেজি), আব্দুল মান্নান (রসায়ন), উম্মে ফাতিমা (বাংলাদেশ ও বিশ্ব পরিচয়), মো. আজমল হোসেন (বাংলা), গোলাম মোস্তফা (গণিত), আশরাফুল আলম (রসায়ন), বাবু সুবাস চন্দ্র পোদ্দার (রসায়ন), লাভলী আখতার, তাসমিন নাহার, মতিনুর (ইংরেজি), উম্মে সালমা (ইংরেজি), মো. আব্দুল জলিল (ব্যবসায় শিক্ষা, মোহাম্মদ ফখরুদ্দীন (রসায়ন), মনিরা জাহান (ইংরেজি), ফাহমিদা খানম পরী (গণিত), লুৎফুন নাহার (গণিত), হামিদা বেগম (গণিত), নাজনীন আক্তার (গণিত), উম্মে সালমা (ইংরেজি), তৌহিদুল ইসলাম (ইংরেজি), সুরাইয়া জান্নাত (ইংরেজি), মো. সফিকুর রহমান-৩ (গণিত ও বিজ্ঞান), মো. শফিকুর রহমান সোহাগ (গণিত ও বিজ্ঞান), নুরুল আমিন (গণিত), মনিরুল ইসলাম (ইংরেজি), রফিকুল ইসলাম (সমাজ বিজ্ঞান), গোলাম মোস্তফা (গণিত), অহিদুজ্জামান (বাংলা), মাকসুদা বেগম মালা, আলী নেওয়াজ আলম করিম, মো. আবুল কালাম আজাদ ও মো. আব্দুর রব এবং বনশ্রী শাখার মো. শফিকুল ইসলাম (ইংরেজি), মো. মাহবুবুর রহমান (পদার্থ বিজ্ঞান), মো. মোয়াজ্জেম হোসেন (গণিত) ও আব্দুল হালিম (গণিত)।

মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ : সহকারী প্রধান শিক্ষক এনামুল হক, মেজবাহুল ইসলাম (ইংরেজি), সুবীর কুমার সাহা (গণিত), মো. সাইফুল ইসলাম,  মোহনলাল ঢালী, বাসুদেব সমদ্দার, বকুল বেগম, আসাদ হোসেন (ইংরেজি), প্রদীপ কুমার বসাক, আবুল খায়ের, শারমীন খানম, মো. কবীর আহমেদ, খ ম কবির আহমেদ, মো. দেলোয়ার হোসেন,  মাও. কামরুল হাসান, মো. রুহুল আমিন-২, মো. কামরুজ্জামান, শেখ শহীদুল ইসলাম, শুকদেব ঢালী, হাসান মঞ্জুর হিলালী, আমান উল্লাহ আমান, হামিদুল হক খান, রমেশ চন্দ্র বিশ্বাস ও চন্দন রায়।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ : প্রভাতি শাখার সহকারী শিক্ষক কামরুন্নাহার চৌধুরী (ইংলিশ ভার্সন), ড. ফারহানা (পদার্থবিজ্ঞান), সুরাইয়া নাসরিন (ইংরেজি), লক্ষ্মী রানী, ফেরদৌসী ও নুশরাত জাহান।

রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ : এ বি এম মইনূল ইসলাম (গণিত), মো. আলী আকবর (গণিত), মো. রেজাউর রহমান (গণিত), মোহাম্মদ কামরুল ইসলাম (ইংরেজি) ও মোহাম্মদ কামরুজ্জামান (রসায়ন)।

মতিঝিল সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় : প্রভাতি শাখার সহকারী শিক্ষক আবুল হোসেন মিয়া (ভৌতবিজ্ঞান), মো. মোখতার আলম (ইংরেজি), মো. মাইনুল হাসান ভূঁইয়া (গণিত), মুহাম্মদ বেলায়েত হোসেন (গণিত), মুহাম্মদ আফজালুর রহমান (ইংরেজি), মো. ইমরান আলী (ইংরেজি), দিবা শাখার সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ কবীর চৌধুরী, এ বি এম ছাইফুদ্দীন ইয়াহ, মো. মিজানুর রহমান, মো. আবুল কালাম আজাদ, মো. জহিরুল ইসলাম ও সহকারী শিক্ষক মো. জামাল উদ্দিন বেপারী।

মতিঝিল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় : প্রভাতি শাখার সহকারী শিক্ষিক নূরুন্নাহার সিদ্দিকা (সামাজিক বিজ্ঞান), দিবা শাখার সহকারী শিক্ষক শাহ মো. সাইফুর রহমান (গণিত), মো. শাহ আলম (ইংরেজি), মোসা. নাছিমা আক্তার (ভূগোল)।

গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাই স্কুল : মো. শাহজাহান সিরাজ (গণিত), মোহাম্মদ ইসলাম (গণিত), জাকির হোসেন (গণিত), মো. শাহজাহান (গণিত), মো. আবদুল ওয়াদুদ খান (সামাজিক বিজ্ঞান), মো. আলতাফ হোসেন খান (ইংরেজি), মো. আযাদ রহমান (ইংরেজি) ও রণজিৎ কুমার শীল (গণিত)।

খিলগাঁও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. নাছির উদ্দিন চৌধুরী।

দুদক ছয় সদস্যের অনুসন্ধান টিমের অন্যান্য সদস্যরা হলেন- সহকারী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম, মো. আবদুল ওয়াদুদ, মনিরুল ইসলাম, ফজলুল বারী ও উপসহকারী পরিচালক আতাউর রহমান।