রবিবার, ৩১ ডিসেম্বর, ২০১৭

ব্যয় বাড়লেও গতি নেই সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার নির্মাণ কাজে!

আজকাল ডেস্ক:কয়েক দফা মেয়াদ বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যয় বাড়লেও গতি নেই সিলেট শহরতলীর বাদাঘাট এলাকায় অবস্থিত আধুনিক কেন্দ্রীয় কারাগারের নির্মাণ কাজ। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিতের নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী ২০১১ সালের ১১ আগস্ট কেন্দ্রীয় কারাগারের নির্মাণ কাজ শুরু হয়। এ বছরের ডিসেম্বরে নগরের জেলরোড থেকে পুরাতন কারাগারটি বাদাঘাটের নবনির্মিত আধুনিক কারাগারে স্থানান্তর হওয়ার কথা থাকেলও তা হয়নি। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্যয় বেড়ে দেড়শ কোটি টাকার প্রকল্প এখন ২২৭ কোটিতে দাঁড়িয়েছে।



এদিকে কারাগারের নির্মাণ কাজ কেন যথাসময়ে শেষ হয়নি সেজন্য গোয়েন্দা সংস্থার একটি দল সার্বিক বিষয়ে তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এতে বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।


জানা যায়- নতুন কারাগারের নির্মাণ কাজ শুরুর পর ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় দেড়শ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত। পরে ২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। তবে এ সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান হাবিব কনস্ট্রাকশন কোম্পানি, কৈশলী কনস্ট্রাকশন কোম্পানি, জেড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি, ঢালি কনস্ট্রাকশন কোম্পানি ও জেবি কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। তাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে আরেক দফা সময় বাড়িয়ে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সময় বেধে দেয় গণপূর্ত বিভাগ। তবুও কাজ শেষ না হওয়ায় ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়।

কারাগার সূত্রে জানা যায়- কারাগারের পুরোপুরি নির্মাণ কাজসহ অন্যান্য কাজ শেষ করতে হলে আরও পাঁচ মাসের প্রয়োজন। কারাগারে এখনও পর্যন্ত কোনও ধরনের গ্যাসের সংযোগ না থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ফ্ল্যাটে গ্যাস সংযোগ নেই। এমনকি কারাগারে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সন্তানদের লেখাপড়া করার জন্য কোনও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও গড়ে ওঠেনি। তাছাড়া কারাগারে আধুনিক প্রযুক্তি কোনও ছোঁয়া না লাগার পাশাপাশি কারা ফটকের প্রধান গেইট এখনও নির্মাণ করা হয়নি।

কারাগারে ৬০ একর জায়গা অধিগ্রহণ করার কথা থাকলেও করা হয়েছে ৩০ একর জায়গা । অবশিষ্ট জায়গা অধিগ্রহণের কোনও প্রক্রিয়া নেই বললেই চলে। ১৭৮৯ সালে সিলেট নগরের ধোপাদীঘির পাড়ে ২৪ দশমিক ৬৭ একর জমির ওপর নির্মাণ করা হয় সিলেট জেলা কারাগার, পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় কারাগারে রূপান্তর করা হয়। বর্তমানে বন্দি ধারণ ক্ষমতা ১ হাজার ২১০ জন। তবে বর্তমান কারাগারে ধারণ ক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ বন্দি রয়েছে। আর সিলেট নগর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে সিলেট সদর উপজেলার বাদঘাটে ৩০ একর জমির ওপর নির্মাণাধীন আধুনিক কেন্দ্রীয় কারাগারটির ধারণক্ষমতা হবে আড়াই হাজার বন্দি।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা যায়- সিলেটের কেন্দ্রীয় কারাগারের নির্মাণ কাজ দ্রুত শেষ না হওয়ার পেছনে রয়েছে প্রভাবশালীদের নানা ধরনের তৎপরতা। কারাগার নির্মাণ কাজ যারা টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়েছিলেন তারা ছাড়াও অন্তত ছয় জনের একটি তালিকা তৈরি করে কয়েক মাস আগে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে গোয়েন্দা সংস্থার একটি দল। ওই তালিকায় উল্লেখ করা হয় কারাগারের নির্মাণ কাজ শুরুর আগে বিরোধ এবং প্রভাবশালীদের দ্বন্দ্বের বিষয়টি। এছাড়া কারাগারে কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কতো টাকার কাজ করিয়েছেন, তাদের কাজের মান কী ধরনের এবং যে পরিমাণ কাজ করার কথা ছিল সেগুলো যথাযথভাবে করেছেন কিনা তা উল্লেখ করা হয়।
গণপূর্ত সূত্রে জানা যায়- ৩০ একর জায়গার মধ্যে মূল কারাগারের ভেতরে রয়েছে ১৪ একর ও বাইরে রয়েছে ১৬ একর জায়গা। কারাগারের বাইরের জায়গায় থাকছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১৩০টি ফ্ল্যাট, ক্যান্টিন, বন্দিদের সঙ্গে সাক্ষাৎকার রুম, এডমিন অফিস, সেন্ট্রাল মসজিদ, এছাড়া স্টিল স্ট্রাকচারড ভবন আছে চারটি, একটি স্কুল। প্রতিটি ভবনের নির্মাণ কাজ সম্পূর্ণ। ভেতরের জায়গায় আছে পুরুষ হাজতি, কয়েদিদের জন্য ছয়তলা বিশিষ্ট চারটি এবং নারী হাজতি কয়েদিদের জন্য তিনটি চারতলা ও দুটি দোতলা ভবন। এছাড়াও কারাগারের পশ্চিম পাশে বন্দিদের আধুনিক চিকিৎসা সেবা প্রদানের জন্য ১০০ শয্যা বিশিষ্ট পাঁচতলা হাসপাতাল, ২০ শয্যা বিশিষ্ট দোতলা মানসিক হাসপাতাল ছাড়াও টিবি রোগীদের জন্য নির্মাণ করা হচ্ছে ২৫ শয্যা বিশিষ্ট দোতলা টিবি হাসপাতাল। কারাগারের চারপাশে উঁচু সীমানা প্রাচীর ও ভেতরে অভ্যন্তরীণ সীমানা প্রাচীরের কাজ এবং কারাগারের মসজিদ, ক্যান্টিন, তিনটি ওয়াচ টাওয়ার নির্মাণ কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। তবে এখনও লিংক রোড (রাস্তা নির্মাণ), ড্রেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুকুর খনন, এসটিপির কাজ এখনো শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্টরা। এমনকি কারাগারের বিভিন্ন ভবনের অভ্যন্তরীণ দরজা, ভবনের রংসহ অনুসাঙ্গিক অনেক কাজও অবশিষ্ট রয়েছে।
সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার আব্দুল জলিল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কারাগারের গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ বাকি রয়েছে। এগুলো শেষ করতে গণপূর্তের আরও কয়েক মাস সময় লেগে যাবে বলে আমাদেরকে জানানো হয়। কারাগারটি আমরা বুঝে পাওয়ার পর বন্দিদেরকে স্থানান্তর প্রক্রিয়া শুরু করবো।’
সিলেট গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মিজানুর রহমান বলেন, ‘কারাগারের বিভিন্ন কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ না হওয়ায় পুরাতন কারাগার থেকে নতুন কারাগারে বন্দিদের নিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। আগামী তিন মাসের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যাবে বলে আমরা আশাবাদী। গ্যাস সংযোগসহ ভবনগুলোর সব কাজ শেষ হয়ে গেলে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে।’