শুক্রবার, ২৪ নভেম্বর, ২০১৭

অস্তিত্ব সংকটে কুশিয়ারা নদী!

জুনেদুর রহমান: বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। কুশিয়ারা নদীর উৎস হচ্ছে বরাক বা বরবক্র নদী। প্রাচীনকালের স্বাধীন রাজ্য মনিপুরের আঙ্গামিনাগা পাহাড়ের ৩০০ কিমি উঁচু স্থান থেকে বরাক নদীর উৎপত্তি। উৎপত্তি স্থান থেকে ৪৯১ কিমি অতিক্রম করে সিলেটের সীমান্তে এসে বরাক নদী দুই শাখায় সুরমা ও কুশিয়ারা নামে ৩০০ কিমি প্রবাহিত হয়েছে মেঘনা নদী গঠন করে। উল্লেখিত নদী দুটো সিলেট বিভাগের বেষ্টনী হিসেবে ধর্তব্য। সিলেটের সীমান্ত থেকে উত্তরে প্রবাহিত স্রোতধারাকে সুরমা নদী এবং দক্ষিণে প্রবাহিত স্রোতধারাকে কুশিয়ারা নামে অবহিত করা হয়। 

কুশিয়ারা এবং সুরমা নদীর উৎপত্তিস্থল অমলসিদে সুরমা নদীর তলদেশ প্রায় শুকিয়ে যাওয়ায় শুষ্ক মওসুমে বরাকের প্রায় ৮৫ শতাংশ প্রবাহ কুশিয়ারা দিয়ে প্রবাহিত হয়। কুশিয়ারার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬১ কিমি, গড় প্রস্থ ২৫০ মিটার এবং বর্ষা মওসুমে গড় গভীরতা প্রায় ১০ মিটার। কুশিয়ারা নদী আসাম রাজ্যের পাহাড়ি এলাকা থেকে প্রচুর পানি এবং পলি বহন করে নিয়ে আসে। আবার প্রবল স্রোতের কারণে ধাবয়ের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়। শেরপুরে সর্বোচ্চ ৩,৭০০ এবং সর্বনি¤œ ৩৩ কিউসেক পানিপ্রবাহ পরিমাপ করা হয়েছে। 

কুশিয়ারা নদী জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, গোলাপগঞ্জ, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ, রাজনগর, মৌলভীবাজার, নবীগঞ্জ, জগন্নাথপুর বিভিন্ন উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। এ নদীর তীরেই ফেঞ্চুগঞ্জ সার কারখানা অবস্থিত।

খননের অভাবে নাব্যতা হারাচ্ছে প্রমত্তা নদী কুশিয়ারা। অস্তিত্ব সঙ্কটে রয়েছে শাখা নদীগুলোও। এককালের গহিন খরস্রোতা কুশিয়ারা এখন ‘মরা গাঙে’ পরিণত হয়েছে। সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলায় কুশিয়ারা নদীর প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে বিশাল বিশাল চর ও অসংখ্য ছোট ছোট ডুবোচর জেগে উঠেছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় মিঠা পানির প্রায় ৬৫ প্রজাতির মাছ বিলুপ্ত হতে চলেছে।

নদী খননের অভাবে বিভিন্ন স্থানে জেগে উঠেছে চর। অন্য দিকে হুমকির মুখে রয়েছে সিলেট বিভাগের বৃহত্তর হাওর হাকালুকিসহ বিভিন্ন ছোট-বড় হাওর ও জলাশয়। তা ছাড়া কুশিয়ারা নদীর সাথে যুক্ত নদীগুলো পরিণত হয়েছে ‘মরা খালে’। ফলে সবচেয়ে বেশি তিগ্রস্ত হচ্ছে হাওর এলাকার মানুষ। কুশিয়ারা নদীর বর্তমান চিত্র এতই করুণ যে, ফাল্গন-চৈত্র মাসে ছোট দ্বীপের অবয়ব নিয়ে কোনো রকম যেন জেগে আছে তার শূন্য বুক। কুশিয়ারা নদী এক দিন আপন ঐশ্বর্যে ভরপুর ছিল। ছোট-বড় ডলফিন, শুশুক, ইলিশসহ বহু প্রজাতির মাছ যেখানে খেলা করত। উত্থাল স্রোতে চলত পাল তোলা নৌকা। লঞ্চ, স্টিমার ও জাহাজ চলত সারা বছর। 

ঘাটে ঘাটে ছিল নৌকার ভিড়। ছিল কুলি-শ্রমিকদের কোলাহল। কুশিয়ারা নদীকে কেন্দ্র করে বালাগঞ্জ বাজার, শেরপুর ঘাট ও ফেঞ্চুগঞ্জ বাজার ছিল সদা কর্মতৎপর সচল নৌবন্দর। বিস্তীর্ণ জনপদে কুশিয়ারা নদীর সেচের পানিতে হতো চাষাবাদ। অনেক পরিবারের জীবিকা নির্বাহের অবলম্বন ছিল এই কুশিয়ারা। কিন্তু এখন নদীর দিকে তাকানো যায় না। দিন দিন যেন সঙ্কীর্ণ হয়ে আসছে তার গতিপথ। অথৈ পানির পরিবর্তে কেবল কান্নার সুরই যেন ভেসে আসে কুশিয়ারার বুক থেকে। তাই তো বছরের বেশির ভাগ সময় স্রোতহীন অবস্থায় থাকছে কুশিয়ারা। আর অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন করার কারণে নদী পাড়ে দেখা দেয় ভয়াবহ ভাঙন।

কুশিয়ারা নদীর তীরবর্তী এলাকা ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, ভারতের বরাক নদীর একটি শাখা নদী হচ্ছে কুশিয়ারা। দীর্ঘ দিন ধরে কোনো প্রকার ড্রেজিং না হওয়ায় নদী নাব্যতা হারাচ্ছে। কুশিয়ারার এ অবস্থায় নৌযান চলাচলে বিঘ্ন ঘটছে। অচল হয়ে পড়েছে অনেক ঘাট। নদীর পানি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে নৌপরিবহনের সাথে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকেরাও বেকার হয়ে পড়েছেন। সেই সাথে কুশিয়ারা নদী তার নিজস্ব গতি হারিয়েছে ঠিকই, কিন্তু প্রতি বছর নদীভাঙনে নিঃস্ব হচ্ছেন কুশিয়ারার তীরবর্তী গ্রামের বাসিন্দারা। ভাঙনে বিলীন হচ্ছে মসজিদ-মন্দির, হাট-বাজার, শিাপ্রতিষ্ঠান, রাস্তাঘাট ও বসতভিটা।