মঙ্গলবার, ১৭ অক্টোবর, ২০১৭

দুই কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ করার সুপারিশ গণতন্ত্র বিষয়ক সেমিনারে বক্তারা

আজকাল ডেস্কঃ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে দুই কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠনের সুপারিশ করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। গণতন্ত্র বিষয়ক এক সেমিনারে তাঁরা বলেন, জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় নির্বাচনী আসনসংখ্যা বাড়িয়ে ৫০০ করা যেতে পারে। এছাড়া জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গণভোট করার সুযোগ রাখা যেতে পারে। বক্তারা গণতন্ত্র সুদৃঢ় করতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীন, শক্তিশালী ও নির্দলীয় ভূমিকা নিশ্চিত করতে সরকারকে পদক্ষেপ নেয়ার সুপারিশ করেন।
গতকাল পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটে (পিআরআই) ‘রিথিংকিং ডেমোক্রেটাইজেশন: কনসেনসাস বিল্ডিং ফর রেজাল্টস’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এ মতামত ব্যক্ত করেন। পিআরআই এবং ইন্টারন্যাশনাল পলিটিক্যাল সায়েন্স এসোসিয়েশন (আইপিএসএ) অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করে।
আইপিএসএ (আরসি ৩৭) চেয়ারম্যান এবং ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিনের এমিরেটাস প্রফেসর ড. জিল্লুর রহমান খান সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির এমিরেটাস প্রফেসর মনজুর আহমেদের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রেহমান সোবহান। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সাবেক অর্থমন্ত্রী এম সাঈদুজ্জামান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার এটিএম শামসুল হুদা, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী, সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. রওনক জাহান, ইত্তেফাক-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার, সাবেক বাণিজ্য সচিব সোহেল চৌধুরী, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন এবং পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক  ড. আহসান এইচ মনসুর প্রমুখ।
সেমিনারে প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে ড. জিল্লুর আর খান বলেন, সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধীদলের ভূমিকা অর্থবহ করতে সংসদের ডেপুটি স্পিকার এবং সংসদীয় কমিটির এসোসিয়েট চেয়ার বিরোধীদলের মধ্য থেকে নির্ধারণ করা যেতে পারে। এছাড়া সংসদে জনগণের সঠিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে আসন বিন্যাস করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে জোটভিত্তিক সরকার ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে যা এক ধরনের জবাবদিহিতার সুযোগ তৈরি করে।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ক্ষমতাসীন দল ৫০ ভাগেরও বেশি আসনে বিনাভোটে নির্বাচিত হয়েছে। এ অবস্থায় তাদেরকে ২০০৮ সালে দেয়া নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি পূরণের দিকে জোর দিতে হবে। গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য বৃহত্ দুই দলের নির্বাচিত ব্যক্তিদের দিয়ে একটি অভ্যন্তরীণ সরকার করারও পরামর্শ দেন তিনি। গণতন্ত্রে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে দুই কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনস্যংখ্যার বিচারে এখানে নিম্নকক্ষে ৫০০ এবং উচ্চকক্ষে ১০০ সদস্য থাকতে পারে। উচ্চকক্ষের সদস্যরা চার বছর আর নিম্নকক্ষে দুই বছরের জন্য নির্বাচিত হবেন। নির্বাচন হবে দুই বছর পর পর। প্রতি দুই বছর অন্তর অন্তর নিম্নকক্ষের সদস্যদের নির্বাচনের পাশাপাশি উচ্চকক্ষের অর্ধেক সদস্য নির্বাচিত হবেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. রেহমান সোবহান বলেন, গত ২৫ বছর ধরে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো দলীয়করণ করা হয়েছে। এখন এসব প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী না করে কোনভাবেই টেকসই নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তোলা ঠিক হবে না। ড. রেহমান সোবহান আরও বলেন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে হবে। যেন সরকারের কার্যক্রমে তারা ভূমিকা রাখতে পারে। বর্তমানে এমপিরা তাদের এলাকা জমিদারি ব্যবস্থার মতো করে চালাচ্ছে। বর্তমানে হরতালে যেসব কাজ করা হয়, তা খুবই অনৈতিক। কারণ এতে সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতা দেয়ার পক্ষে তিনি মত দেন।
ড. আকবর আলী খান বলেন, বর্তমানে রাজনীতিতে যে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে তাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষেও সুষ্ঠু নির্বাচন করা সম্ভব নয়। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য আগে সংবিধানের ত্রুটি দূর করতে হবে। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব ব্যবস্থার পক্ষে মত দিয়ে তিনি বলেন, এ ব্যবস্থায় ৫১ ভাগ ভোট পেতে হলে জোট করতে হবে। ফলে আলাপ-আলোচনা ও সংলাপের সুযোগ তৈরি হবে। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে গণভোট করার সুযোগ রাখা যেতে পারে উল্লেখ করে ড. আকবর আলী বলেন, এক্ষেত্রে হরতাল ও বিশৃঙ্খলা কিছুটা কমতে পারে।
ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো নির্দলীয় ও স্বাধীন হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আমাদের দেশে তা দেখা যায় না।
ড. রওনক জাহান বলেন, আমাদের দেশে নির্বাচনের আগে সব দল মুভমেন্ট পলিটিক্স (মাঠ গরম) করে। এ নিয়েও নানা বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়। গণভোট করা হলে যদি মুভমেন্ট পলিটিকেসর কারণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় তবে গণভোটের মূল উদ্দেশ্যই ভেস্তে যাবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের সংসদে এমপিরা নিজ দলের বিরুদ্ধে কথা বলতে চান না। কারণ পরবর্তীতে নমিনেশন পেতে সমস্যা হবে। এ ধরনের প্রবণতা দূর করতে দলের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সৃষ্টি করতে হবে।
এটিএম শামসুল হুদা বলেন, গণতন্ত্র সুদৃঢ় করতে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো (বিচার বিভাগ, দুদক, নির্বাচন কমিশন ইত্যাদি) শক্তিশালী ও স্বাধীন করতে হবে। অন্যথায় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিশ্বাস ও আস্থা আসবে না। বিশৃঙ্খলাও কমবে না। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার বিষয়ে তিনি বলেন, তাঁকে বসিয়ে না রেখে ক্ষমতা দেয়া দরকার।
তাসমিমা হোসেন বলেন, গণতন্ত্র গতিশীল করতে নানা পরামর্শ দেয়া হলেও এর বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় থেকে যায়। আগেও দেখা গেছে বড় দুই দলের মধ্যে মতবিরোধ। আর তা সমাধান না হওয়ায় বিদেশিরা এসেছে। এরপরও সমাধান না হওয়ায় অবস্থার অবনতিও আমরা দেখেছি। এ পরিস্থিতি থেকে আমাদেরকে শিক্ষা নিতে হবে। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতিকে কিছু ক্ষমতা দেয়া যেতে পারে। এতে গণতন্ত্র শক্তিশালী হবে। নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে যেন তাদের ওপর মানুষের আস্থা বৃদ্ধি পায়।
ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, সরকার প্রধান ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে ক্ষমতা ভাগাভাগি করা প্রয়োজন। সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রপতিকে কিছু ক্ষমতা দেয়া হলে গণতন্ত্র গতিশীল হবে। দুই কক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ব্যবস্থা করার আগে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা দরকার।
অনুষ্ঠানশেষে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবন ও কর্মকাণ্ডের মূল্যায়নের ভিত্তিতে ‘থার্ড ওয়ার্ল্ড ক্যারিশম্যাট: শেখ মুজিব অ্যান্ড স্ট্র্যাগল ফর ফ্রিডম’ বইয়ের অনুবাদমূলক বই ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সম্মোহনী নেতৃত্ব ও স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বইটি লিখেছেন ড. জিল্লুর আর খান। অনুবাদ করেছেন অজয় দাশগুপ্ত। প্রকাশক প্রথমা প্রকাশনী।