বুধবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৭

সিলেটে তৈরী হচ্ছে দেশের প্রথম ইলেকট্রনিক্স সিটি

আজকাল প্রতিবেদন:সিলেট শহরে থেকে ২০ কিলোমিটার দূরবর্তী কোম্পানীগঞ্জের খলিতাজুরি এলাকার ১৬২ একর জায়গাজুড়ে তৈরি হচ্ছে ইলেকট্রনিক সিটি। কিছুদিনের মধ্যেই এই অজোপাড়া গা হয়ে উঠবে বাংলাদেশের এক আকর্ষনীয় স্থানে। অবহেলিত এলাকাটি ইলেকট্রনিক বিশ্বে আলো ছড়াবে। কর্মকর্তরা জানান প্রকল্প এলাকায় দুটি অংশের একটি অংশে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার। অন্যটিতে আবাসন, স্কুল-কলেজ, হাসপাতাল, শপিং সেন্টার ইত্যাদি থাকবে। সব মিলে  ৪০টি স্থাপনা, সেবা প্রতিষ্ঠান ও সুযোগ-সুবিধায় ভরে উঠবে সীমান্ত এলাকার সবুজে ছায়ায় নির্মল আকাশের নিচ। আগামী দশ বছরের মধ্যে সিলেট সহ দেশ-বিদেশের ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে এখানে। সব মিলিয়ে অপার সম্ভাবনার হাতছানি দিচ্ছে এই কোম্পানীগঞ্জ। 



ভারতের জৈন্তা-খাসিয়া পাহাড়ের পাদদেশে সীমান্ত নদী ধলাই বিদৌত এই এলাকার পরিচিতি রয়েছে বিশেষ করে পাথর সমৃদ্ধ এলাকা বলে। সেই ব্রিটিশ আমল থেকে এখানকার নদী ও প্রসিদ্ধ ভোলাগঞ্জ পাথর কোয়ারী থেকে পাথর আহরণ হয়ে আসছে। একানের বোল্ডার পাথর এতই সাদা যে একে ‘সাদা সোনা’ বলা হয়। যদিও এখন এই পাথর আহরণে পদ্ধতিগত ত্রটির কারণে পরিবেশবাদী সংগঠনের আপত্তি এবং উচ্চ আদালতের নিষেধাঞ্জা রয়েছে।

যোগাযোগের ক্ষেত্রে পশ্চাত্পদ এই এলাকায় সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটান এরশাদ আমলে তত্কালীন সিলেট-১ আসনের এমপি হুমায়ূন রশীদ চৌধূরী। তবে ধারণ ক্ষমতার বেশী পাথরবাহী ট্রাক নিয়মিত চলাচলের কারণে সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। যেহেতু এখানে কোন শিল্প কারখানা নেই। কিছু পরিমাণ বোরো জমি ও প্রচুর খাস জমি ছাড়া বিকল্প কোন  কর্মসংস্থানেরও সুযোগ নেই। এখানের অধিকাংশ মানুষ পাথর শ্রমিক। তাই বহু চিন্তাভবনার ফলশ্রুতিতে এখানে গড়া হচ্ছে ইলেকট্রনিক সিটি।

সূত্র মতে প্রকল্পে তিন ধরনের সুবিধা থাকবে প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আইসিটি পার্ক এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির (পিপিপি) ভিত্তিতে বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক প্রকল্প। সিলেট ইলেকট্রনিক সিটির প্রকল্প পরিচালক মো. গোলাম সরওয়ার ভূঁইয়া বলেছেন,ইলেকট্রনিক পণ্য, যন্ত্রাংশ এবং সফটওয়্যার উতপাদন করে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করা অন্যতম উদ্দেশ্য। তিনি জানান, প্রকল্পের মৌলিক কাঠামোর কাজ ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ হবে। বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের পরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেছেন, সিলেট ইলেকট্রনিক  সিটিতে ইতিমধ্যে দেশি-বিদেশি অনেক প্রতিষ্ঠানই বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। ইলেকট্রনিক পণ্য নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হায়ার ১৩৭ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রস্তাব দিয়েছে।

কোমপানীগঞ্জ উপজেলার খলিতাজুরি বিলেরপাড় এলাকায়  প্রকল্প স্থলে যেতে মূল সড়কের পাশের ছোট খাল পেরিয়ে সেখানে যেতে হয়। প্রকল্প এলাকায় প্রশাসনিক ভবনের কাজ চলছে। এর ফ্লোরের আয়তন ৩১০৭৭ বর্গফুট। এরই মধ্যে সাইট অফিসের কাজ শেষ হয়েছে। পুরো প্রকল্প বিলের ওপর হওয়ায় মাটি ভরাট করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ডকইয়ার্ড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কস এর নির্মাণ কাজের দায়িত্বে রয়েছে। কর্মকর্তারা জানান, প্রাথমিক অবকাঠামোর কাজ শেষ করে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য কাজ হবে।বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের উপ পরিচালক মো. মাহফুজুল কবির বলেছেন, সিলেটইলেকট্রনিক সিটিসহ মোট ৪০টি প্রকল্পের কাজ চলছে। এর মধ্যে ১১টি বেসরকারি। তিনি বলেন বড় পরিসরে আইটি প্রতিষ্ঠান নিয়ে হবে হাইটেক পার্ক বা সিটি ও  ইলেকট্রনিক সিটি। এ কর্মকর্তরা বলেন এ ধরনের প্রকল্প কোনো বিশেষ এলাকাকে কেন্দ্র করে করা হয়। এখানে সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার বা ইলেকট্রনিক পণ্য উত্পাদন হবে। মোটকথা আইটি বা ইলেকট্রনিক শিল্পের সব কিছুই এখানে থাকবে। ছোট পরিসরের বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ডিভাইস উতপাদন হবে আইটি পার্ক বা ভিলেজে। সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার দুটোরই কাজ হবে এখানে। এক বা একাধিক ভবনেই হবে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক (এসটিপি)। প্রশিক্ষণ দিয়ে আইটি কিংবা সফটওয়্যার টেকনোলজির ওপর দক্ষ মানবসমপদ এবং উদ্যোক্তা তৈরি করা হবে ইনকিউবেশন সেন্টারে।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ  আহমেদ পলক যা বললেন

সম্প্রতি তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক প্রকল্প এলাকা সফর কালে তিনি বললেন জাপান ও কোরিয়া হাইটেক ইন্ডাস্ট্রির কার্যক্রম ৩০ বছর আগেই শুরু করেছে। এখন বিশ্বে এ সেক্টরে তারাই নেতৃত্ব দিচ্ছে। আবার সফটওয়্যার খাতে ভারত ও মালয়েশিয়া মোটামুটি এগিয়ে গিয়েছে। একই ভাবে  ফিলিপাইন, ভারত, শ্রীলঙ্কা এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন আমাদের সফটওয়্যার খাত যে কোনো এক সময় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হতে পারে, তা কেউ কল্পনা করেনি সাড়ে আট বছর আগে।

বাংলাদেশের তরুণদের মেধাশক্তি কাজে লাগানোর জন্য বিভিন্ন জায়গায় এসব প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে,উল্লেখ করে তিনি বলেন একই উদ্দেশ্যে আমরা সিলেটে ইলেকট্রনিক সিটি গড়ে তুলছি। তিনি বলেন সিলেটে যেহেতু আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, এখানকার অনেক প্রবাসী ইউরোপ ও আমেরিকায় বসবাস করছে, তাদের মধ্যে অনেক ধনাঢ্য ব্যবসায়ীও আছেন। তাঁরা বৈচিত্রময় ব্যবসায় বিনিয়োগের সুযোগ খুঁজছেন। সে কারণে আমরা সিলেটকে বেছে নিয়েছি। এখানে ১৬২ একর জায়গা পেয়েছি। আরো প্রায় ৪৫০ একর অনাবাদি জায়গা খালি পড়ে আছে। এসব অনাবাদি জায়গা কিভাবে ব্যবহার করা যায় সে জন্য আমরা এখানে ইলেকট্রনিক সিটির কাজ হাতে নিয়েছি। মূলত আমাদের লক্ষ্য হচ্ছে দেশে ক্রমবর্ধমান ইলেকট্রনিক পণ্যের যে চাহিদা পূরণ করা।

পলক বলেন, দেশে ১০ কোটি মোবাইল ফোন, সাড়ে তিন কোটি স্মার্টফোন ব্যবহার হচ্ছে, ২০ লাখ রেফ্রিজারেটর বিক্রি হয় প্রতিবছর। বছরে প্রায় তিন কোটি মোবাইল ও পাঁচ লাখ ল্যাপটপ আমদানি হয়। এখানে যে বিপুল সংখ্যক ক্রেতা বা ব্যবহারকারী তৈরি হয়েছে-এর চাহিদা পূরণে সিলেটে ইলেকট্রনিক সিটি গড়ে তোলা হচ্ছে। এ ছাড়া এখানে আইটি বা সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কও গড়ে তোলা হবে। সঙ্গে একটি ইনকিউবেশন সেন্টার হবে, যাতে সিলেটের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর মেধাবী শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান সিলেটেই করা যায়। মন্ত্রী বলেন দুই বছরের মধ্যে প্রকল্পের প্রাথমিক কাজ শেষ হবে এবং পাঁচ থেকে ১০ বছরের মধ্যে সিলেটসহ দেশ-বিদেশের ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। এভাবেই আমরা দেশের বিভিন্ন প্রকল্পে বিভিন্ন সেক্টরে প্রায় ২০ লাখ লোকের কর্মসংস্থান কিভাবে করা যায় পরিকল্পনা করছি।


ভারতের মেঘালয় সীমান্তঘেঁষা এ এলাকার শত শত একর জমি অনাবাদি। পাথর শ্রমিক ছাড়া এখানে তেমন কোন শ্রমের ব্যবস্থা নেই। এই অসচ্ছল মানুষের নতুন কর্মসংস্থানের আশায় মানুষ প্রহর গুনছে।  সমপ্রতি এ অবস্থার অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে। দেশের ইলেকট্রনিক পণ্য, যন্ত্রাংশ ও সফটওয়্যার খাতের অন্যতম প্রাণকেন্দ্র গড়ে তোলার কাজ দিন রাত চলছে। প্রকল্প এলাকায় উপস্থিতি এলাকার নিস্তন্ধতা বঙ্গ হয়েছে। স্থানীয় অনেকেরই কাজ মিলেছে এ প্রকল্পে। বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের পরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেছেন ইলেকট্রনিক সিটি সামনে রেখে কোমপানীগঞ্জের রাস্তাঘাট ও যোগাযোগব্যবস্থার উন্নতি ঘটবে। একসময় স্থানটি শহরে রূপ নেবে। তখন এখানকার অর্থনীতি সচল হবে।

কর্মকর্তরা জানান, দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে দেশের প্রথম ইলেকট্রনিক্স সিটির কাজ নির্মাণ কাজ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ প্রকল্পে ১৮০ কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়ন হবে।  উল্লেখ্য, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগ ইলেকট্রনিক্স সিটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। গত বছর ২১ জানুয়ারি সিলেট সফরে এসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আনুষ্ঠানিক ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।