রবিবার, ৯ জুলাই, ২০১৭

দুই হাজার কোটি টাকা সিন্ডিকেটের পকেটে

আজকাল রিপোর্ট: কৃত্রিম সংকট তৈরি করে চালের দাম বাড়িয়ে বাজার থেকে অতিরিক্ত প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে ব্যবসায়ীদের একটি চক্র।


এরা প্রতিদিন সারা দেশে গড়ে ৩৪ হাজার ৯২৪ মেট্রিক টন (মোটা ও সরু) চাল বিক্রি করেছে।

ক্রেতাদের কাছ থেকে কেজিপ্রতি মোটা চালে আট টাকা (৫০ টাকা কেজি) এবং সরু চালে ছয় টাকা (৬০ টাকা কেজি) বেশি আদায় করেছে। শুল্ক কমানোর আগে প্রায় আড়াই মাসে ২৬ লাখ ১৯ হাজার তিনশ’ মেট্রিক টন চাল বিক্রি করে মোট এক হাজার ৯৩৮ কোটি ৩১ লাখ ৮০ হাজার টাকা পকেটে তুলেছে তারা।

সরকার চাল ব্যবসায়ীদের এ চক্রটিকে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছে না। এদের নামও প্রকাশ করছে না। ফলে এবারও চক্রটি অন্ধকারেই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

অভিযোগ উঠেছে, আমদানি শুল্ক কমানোর জন্য সরকারের ওপর চাপ তৈরির জন্য ব্যবসায়ীদের চক্রটি পরিকল্পিতভাবে এ কাজ করেছে। এর সঙ্গে একাধিক প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত। সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে প্রভাবশালীদের সম্পর্ক আছে। যে কারণে কখনই এদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। তাই বারবার বড় ধরনের অপরাধ ও আর্থিক কেলেংকারি করেও এরা পার পেয়ে যায়। চাল কেলেংকারিতেও এই চক্রই জড়িত। মূলত এরাই আমদানি শুল্ক কমানোর লক্ষ্য স্থির করে চাল নিয়ে কারসাজি করেছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সাধারণ ভোক্তারা। সরকারের ভাবমূর্তিও দারুণভাবে ব্যাহত হয়েছে। এরপরও সরকার জড়িত ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, শুধু চাল সিন্ডিকেট নয় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিটি ক্ষেত্রে এ ধরনের ভয়াবহ দুর্নীতির সঙ্গে সরকারি দলের প্রভাবশালী লোকজন জড়িত। কিন্তু কোনো ঘটনায় তাদের শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় এসব দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহার করার সাহস পাচ্ছে।

চলতি বছর এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত চালের বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৪৮ থেকে ৫০ টাকার আশপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। সরু চালের দাম আরও বেশি। চালের দামের এই ঊর্ধ্বগতিতে সারা দেশে জনজীবনে বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে মানুষকে আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের হিসাব মেলাতে অন্য খাতে খরচ কমানোর পথ বেছে নিতে হচ্ছে। কেউ দিনে ৩ কেজি চালের চাহিদা কমিয়ে আড়াই কেজিতে নামিয়ে এনেছেন। অথচ এ সময়ের মধ্যে দেশের কোথাও চালের কোনো সংকট ছিল না। মোকামগুলোর সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল সচল। ফলে ঢাকাসহ সারা দেশে শত শত ট্রাকে প্রতিদিন হাজার হাজার টন চাল সরবরাহ হয়েছে। এরপরও চালের দাম বাড়ানো হয়েছে।

উল্লেখ্য, এর আগে ২০০৭-০৮ অর্থবছরে মোটা চালের দাম কেজিপ্রতি ৪০ টাকায় উঠেছিল।

অসাধু এই সিন্ডিকেট বাজার থেকে শুধু চালের অতিরিক্ত দাম হাতিয়েই ক্ষান্ত হয়নি। এরা সরকারকে অনেকটা জিম্মি করে চাল আমদানির শুল্ক হার ইচ্ছামতো কমিয়ে নিয়েছে। আগে বেসরকারি খাতে চাল আমদানিতে শুল্ক হার ২৮ শতাংশ ধার্য ছিল। এখন সেটা ১৮ শতাংশ কমিয়ে মাত্র ১০ শতাংশ নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এখন ব্যবসায়ীদের নতুন আবদার মিলার ও অটো মিলারদের কাছ থেকে সরকার ধান-চাল সংগ্রহের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তা পূরণ করতে হলে কেজিপ্রতি ৩-৪ টাকা প্রণোদনা দিতে হবে।

বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ বলেন, দেশে কোথাও চালের সংকট নেই। পর্যাপ্ত চাল মজুদ আছে। বাজারে একটা সাময়িক সংকট হয়েছে। কিছু ব্যবসায়ী সরকারকে অসহযোগিতা করছে। তারা পরিকল্পিতভাবে চালের দাম বাড়িয়েছে। সরকার তাদের নজরে রেখেছে। তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী দেশে ২ কোটি ৮৬ লাখ ৯৫ হাজার ৭৬৩টি পরিবার রয়েছে। পরিবারপ্রতি ৫ দশমিক ৫৭ জন সদস্য ধরে মোট জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬ কোটি। এর মধ্যে ১ কোটি ৩৫ লাখ ৪২ হাজার ১৩১টি পরিবারের সদস্য সংখ্যা হচ্ছে ৭ কোটি ৫৪ লাখ ২৯ হাজার ৬৭১। এসব পরিবারের শতভাগ সদস্য বাজার থেকে চাল কেনার ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে ৭০ ভাগ পরিবার মোটা চালে অভ্যস্ত। ৩০ ভাগ পরিবার খায় সরু চাল।

হিসাব করে দেখা গেছে, চাহিদা পূরণের জন্য এসব পরিবার প্রতিদিন গড়ে ২ কেজি ১৬০ গ্রাম চাল কিনে থাকে। এ পরিমাণ চাল কিনতে গিয়ে তারা দিনে যথাক্রমে মোটা চালের ক্ষেত্রে ১৭ টাকা ২৮ পয়সা এবং সরু চালের ক্ষেত্রে ১২ টাকা ৯৬ পয়সা বেশি দিয়েছে।

এই হিসাবে গত আড়াই মাসে ভোক্তারা মোটা চাল কিনেছেন ২ কোটি ৪৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮০০ কেজি (২৪৪৪৬ টন)। প্রতি কেজিতে গড়ে ৮ টাকা বেশি দেয়ায় আড়াই মাসে এক হাজার ৪৬৬ কোটি ৮০ লাখ ৮০ টাকা অতিরিক্ত দিয়েছেন। একই সময়ে সরু চাল বিক্রি হয়েছে এক কোটি ৪৭ লাখ ৮ হাজার কেজি (১০৪৭৮ টন)। প্রতি কেজি ৬ টাকা বাড়তি দেয়ায় ৭৫ দিনে ৪৭১ কোটি ৫১ লাখ টাকা বেশি দিয়েছেন ক্রেতারা।

সরকারি খাদ্য গুদামে মজুদ কমে যাওয়া এবং হাওরে বন্যার ধুয়ো তুলে চাল ব্যবসায়ীদের কথিত সিন্ডিকেট এ বিপুলসংখ্যক মানুষের নিত্যচাহিদাকে পুঁজি করে অতিমুনাফার খেলায় মেতেছে।

ফলে সাধারণ ভোক্তারা এপ্রিল থেকে জুন মাস পর্যন্ত বিশাল অংকের টাকা বেশি দিয়ে বাজার থেকে চাল কিনে খেয়েছেন। এ অতিরিক্ত টাকা অসাধু অটো রাইস মিলার, রাইস মিলার, আড়তদার, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীর পকেটে গেছে।

খাদ্যমন্ত্রী অ্যাড. কামরুল ইসলাম জাতীয় সংসদে বলেছেন, গুদামে পর্যাপ্ত চাল মজুদ রয়েছে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট করে চালের দাম বাড়িয়েছে। ইতিমধ্যে তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) তথ্য অনুযায়ী ৩০ জুন সরকারি গুদামগুলোতে ১ লাখ ৫০ হাজার টন চাল মজুদ রয়েছে। এর প্রভাবে চলতি বছরের এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত আড়াই মাসের ব্যবধানে গরিবের মোটা চালের দামে দফায় দফায় উল্লম্ফন হয়। ৩৩ টাকা থেকে ৫০ টাকার মধ্যে মোট ১৩টি স্তরে দাম ওঠানামা করেছে। ৩০ জুন পর্যন্ত এসব স্তরের ভিত্তিমূল্য থেকে অতিরিক্ত গড় মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮ টাকা। একইভাবে সরু চালের অতিরিক্ত দাম বেড়েছে ১২-১৪ টাকা। এ সময়ে ৪৬ থেকে ৬০ টাকার মধ্যে মোট ১৪টি স্তরে দাম ওঠানামা করেছে। এতে গড় অতিরিক্ত মূল্য দাঁড়িয়েছে ৬ টাকা।

কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান যুগান্তরকে বলেন, সরকার বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়নি। খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ইগো থেকে মজুদ কমে যাওয়া সত্ত্বেও সময়মতো আমদানির উদ্যোগ নেয়নি। অভ্যন্তরীণ বাজার থেকে সময়মতো খাদ্য সংগ্রহের ঘোষণা দেয়নি। যে মূল্য ঘোষণা করেছে সেটা যৌক্তিক।

তবে তা আরও আগে ঘোষণা আসা উচিত ছিল। সেটি না হওয়ায় চালের মিলার, আড়তদার, পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা এর শতভাগ সুযোগ কাজে লাগিয়েছে। ফলে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আবার সরকারের যথাযথ মনিটরিং দুর্বলতার কারণে এই সিন্ডিকেটকে প্রতিহত করতে পারেনি।

তিনি বলেন, এখন সরকারই যেহেতু বলছে, অসাধু চক্রটি চিহ্নিত। তাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর এ পথে পা বাড়াতে না পারে।

বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) জরিপ বলছে, দেশে মাথাপিছু চাল গ্রহণের পরিমাণ ৪৬৩ গ্রাম। এ হিসাবে দেশে প্রতিদিন চালের প্রয়োজন হয় ৭ কোটি ৪০ লাখ ৮০ হাজার কেজি (৭৪ হাজার ৮০ টন)। তবে কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, ১ কোটি ৫১ লাখ ৮৩ হাজার ১৮৩টি কৃষি পরিবার রয়েছে। অর্থাৎ এসব পরিবার সরাসরি উৎপাদন করে বলে তাদের বাজার থেকে চাল কিনতে হয় না।

তবে সম্মিলিতভাবে এদের চাল ভোগের পরিমাণ হচ্ছে দিনে ৩৯ হাজার ১৫৬ টন। বাকি ৩৪ হাজার ৯২৪ টন চাল বাজার থেকে কেনা হয়। যেসব পরিবার ধান উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত নয় তারা কেনা চাল গ্রহণ করে। এ হিসাবে ৫ কোটি ২৮ লাখ ৭৬৯ জন মানুষের প্রতিদিন ২৪ হাজার ৪৪৬ টন বা ২ কোটি ৪৪ লাখ ৪৬ হাজার ৮০০ কেজি মোটা চালের প্রয়োজন হয়। আর এ পরিমাণ বিক্রি করতে গিয়ে বিক্রেতা প্রতিদিন অতিরিক্ত মুনাফা করেছে ১৯ কোটি ৫৫ লাখ ৭৪ হাজার ৪০০ টাকা।

অন্যদিকে ২ কোটি ২৬ লাখ ২৮ হাজার ৯০২ জন সরু চালভোগীর প্রতিদিনের চাহিদা ১০ হাজার ৪৭৮ টন বা ১ কোটি ৪৭ লাখ ৮ হাজার কেজি। এ পরিমাণ সরু চাল বিক্রি থেকে সিন্ডিকেট বাড়তি হাতিয়ে নিয়েছে ৬ কোটি ২৮ লাখ ৬৮ হাজার টাকা।

বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত আড়াই মাসে দেশের কোথাও চালের কোনো সংকট তৈরি হয়নি। মোকামগুলোর সঙ্গে সারা দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল সচল। ফলে ঢাকাসহ সারা দেশে শত শত ট্রাকে প্রতিদিন হাজার হাজার টন চাল সরবরাহ হয়েছে।

ফলে এ ব্যবসায় যুক্ত প্রায় সব বড় ব্যবসায়ীরই নিজস্ব গোডাউন এবং দোকানেও ছিল শত শত টন চালের মজুদ। ওই চাল পাইকারি ও খুচরা বাজার থেকে শুরু করে গলির মোড়ে মুদি দোকানেও স্থান পেয়েছে। ওই সময়ে চাল কেনার উদ্দেশ্যে বাজারে গিয়ে কেউ খালি হাতে ফিরেছে সারা দেশের কোথাও এমন একটি নজিরও নেই। কিন্তু দাম বেড়েছে রাজধানী ছাপিয়ে প্রত্যন্ত এলাকায়ও। সর্বত্রই চালের ছড়াছড়ি। তবু আকাশছোঁয়া দাম। তাও স্থিতিশীল ছিল না। বরং সপ্তাহান্তে দফায় দফায় বেড়েছে দাম।

২০ জুন সরকার চালের ওপর আমদানি শুল্ক হ্রাস করে। শুল্ক কমানোর প্রজ্ঞাপন জারির দিন থেকে প্রায় প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন স্থলবন্দর দিয়ে শত শত ট্রাক চাল দেশে প্রবেশ করেছে। এতে ১০০ টাকার চাল আমদানিতে এখন ১৮ টাকা কম শুল্ক দিতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।

কিন্তু এরপরও সারা দেশের ভোক্তারা এখনও এর সুফল পাচ্ছে না। এখন ব্যবসায়ীদের নতুন আবদার মিলার ও অটো মিলারদের কাছ থেকে সরকার ধান-চাল সংগ্রহের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে তা পূরণ করতে হলে কেজিপ্রতি ৩-৪ টাকা প্রণোদনা দিতে হবে। পাশাপাশি দেশে প্লাস্টিকের মোড়কজাত বস্তায় চাল সরবরাহ বন্ধের আদেশ প্রত্যাহার করতে হবে।

হঠাৎ করে চালের মজুদ কমে যাওয়ার নেপথ্যে খাদ্য বিভাগকেই দায়ী করেছেন ব্যবসায়ীরা।

এ প্রসঙ্গে নওগাঁ ধান-চাল আড়তদার সমিতির সভাপতি নিরোধ চন্দ্র সাহা যুগান্তরকে বলেন, খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারা দূরদর্শী হলে আগাম সংকটের আভাস পেতেন। দেশের জন্য কমপক্ষে ৭ লাখ টন চাল মজুদ রাখতে হয়। সেই মজুদ আড়াই লাখ টনের নিচে নেমে যাওয়ার পরও যদি কেউ বুঝতে না পারেন সেটা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ব্যর্থতা। এর সঙ্গে সিলেটের হাওরসহ বিভিন্ন স্থানে বোরো ধানের ক্ষতির বিষয়টি যোগ হওয়ার কথা।

তিনি দাবি করেন, এ পরিস্থিতিতে সংকট অবধারিত ছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিক ব্যবসা করেছে বলে বাজারে চালের সরবরাহ ছিল। তবে দাম কিছুটা বেড়েছে বলে তিনি স্বীকার করেন।