বৃহস্পতিবার, ২৯ জুন, ২০১৭

গ্রেনফেল টাওয়ারে নিহত হোসনা ও তার মায়ের লাশ শনাক্ত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক:লন্ডনের গ্রেনফেল টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক হোসনা ও তার মায়ের লাশ শনাক্ত করা হয়েছে। অগ্নিকাণ্ডের দু’সপ্তাহ পর তাদের লাশ শনাক্ত করা হয়েছে। ডেন্টাল রেকর্ড পরীক্ষার মাধ্যমে মা-মেয়ের লাশ শনাক্ত করা হয় বলে তদন্তকারী কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে পরিবারের সদস্যরা বৃহস্পতিবার সকালে এ প্রতিবেদককে জানান।
এদিকে দেশে থাকা পরিবারের কর্তা কমরু মিয়ার পরিবার তাদের লাশ বাংলাদেশে পাঠানো দাবি জানিয়েছিল। কিন্তু কমরু মিয়ার লন্ডনে বেচে থাকা সন্তানের ইচ্ছায় হোসনা ও তার মায়ের দাফন হবে লন্ডনেই।


তবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজ বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ নাগরিক কমরু মিয়াসহ তার পরিবারের ৫ সদস্যের মধ্যে তিনজনের লাশের কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। ২৩ বছর বয়সী হোসনার লাশ পাওয়া যায় ১৭ তলার লিফটের পাশে। তার মা ৬৪ বছর বয়সী রাবেয়া বেগমকেও একই ফ্লোরে নিজেদের ফ্লাটে পাওয়া যায়।
তবে কিছু আনুষাঙ্গিকতা শেষ না হওয়ায় হোসনা ও তার মায়ের জানাজার সময় এখনও নির্ধারিত হয়নি। জানাজা শেষে লন্ডনেই তাদের দাফন হবে বলে পরিবার সূত্র জানিয়েছে। জানাজা ইস্ট লন্ডন মসজিদে অনুষ্ঠিত হবে।
এদিকে, মা-মেয়ের লাশ পাওয়া গেলেও বাবা ও দু’ছেলের লাশ শনাক্ত না হওয়া ও ভিন্ন ভিন্ন স্থান থেকে লাশ উদ্ধারের ঘটনায় কিছু ব্রিটিশ মূলধারার মিডিয়ার ‘গালগপ্পোধর্মী সাংবাদিকতা’র বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। এর আগে ৯০ বছরের অশীতিপর বৃদ্ধ কমরু মিয়াকে নিচে নামানো সম্ভব না হওয়ায় দেড় ঘণ্টা সময় পেয়েও ভবন থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেননি হোসনা, তার মা ও দু ভাই এমন আবেগ দিয়ে গল্পময় রিপোর্ট প্রকাশ করে কিছু ইংলিশ দৈনিক। বরং পরিবারটির বাকি সব সদস্য কমরু মিয়াকে রেখে নিজেদের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেননি বলেও উল্লেখ করা হয় রিপোর্টগুলোতে। অথচ, সুযোগ আর দেড় ঘণ্টার মতো সময় পেলে দু’জন তরুণ ছেলেসহ পরিবারের অন্য চার সদস্যের পক্ষে কমরু মিয়াকে কাঁধে করে হলেও বয়ে নামানো সেক্ষেত্রে অসম্ভব হতো না।
উল্লেখ্য, ভবনের ১৭ তলার ১৪৪ নম্বর ফ্ল্যাটে মা-বাবা আর ভাইদের সঙ্গে থাকতেন হোসনা বেগম। কমরু মিয়াদের পারিবারিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সেন্ট্রাল লন্ডনের বেঙ্গল রেস্টুরেন্ট। প্রায় ৯০ বছর বয়সী কমরু মিয়া অবসরে ছিলেন। তাদের মূল বাড়ি মৌলভীবাজার সদর উপজেলার খৈসাউড়া গ্রামে।
এদিকে, চলতি বছর শেষেও নিখোঁজ অনেকের লাশ না মেলার আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন মেট্রোপলিটন পুলিশের মুখপাত্র ফিওনা মেকরম্যাক। মৃতের প্রকৃত সংখ্যাও কখনও নিশ্চিত না হওয়ার শঙ্কার কথা ব্যক্ত করেছে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড।
জানা গেছে, আর যেসব লাশ শনাক্ত হবে সেটি কোন পরিবারের সেটি নিশ্চিত হওয়া গেলেও সমবয়সী একাধিক ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া দুরুহ হবে। কারণ, মৃত ব্যক্তিদের ডিএনএ মিলিয়ে দেখার মতো ব্যবহার্যগুলোও পুড়ে গেছে। গত ১৪ জুনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এ পর্যন্ত ৮০ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ। নিহতদের বেশিরভাগই ২৩টি ফ্ল্যাটের বলে জানা গেছে। উত্তর কেনসিংটনের ভবনটিতে মোট ১২৯টি ফ্ল্যাট ছিল। পুলিশ যথাসম্ভব বিভিন্ন মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করছে। এবং তাদের থেকে এ ঘটনা সম্পর্কে তথ্য জানার চেষ্টা করছে। অনুসন্ধানে সাতজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি থেকে জানা যায়, ছয় মাস বয়সী এক মৃত শিশুকে পাওয়া গেছে মৃত মায়ের হাতের মধ্যে।
শিশুটির মা ফারাহ হামদানকে ১৯ ও ২০ তলার মধ্যখানে পাওয়া যায় । এ সময় তার হাতেই ছিল তার ৬ মাস বয়সী হতভাগ্য শিশু লিনা। একই সঙ্গে লিনার ৮ বছর বয়সী বোন মালিককে ২০ তলা থেকে উদ্ধার করা হলেও হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়। তবে, জীবিতরা ও নিহতদের স্বজনরা এ ঘটনার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন।
ডিপুটি সুপারেন্ডেন্ট ফিউনা ম্যাককরম্যাক বলেন, যে অনুসন্ধান এবং পুনরুদ্ধার অভিযান ও শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া শেষে সম্পূর্ণভাবে মৃত্যুর সংখ্যা জানতে পারা যাবে। তবে এর জন্য এ বছর পুরোটাই লেগে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, আমরা নিশ্চিত যে ৮০ জন মানুষ হয়তো মারা গেছে নয়তো নিখোঁজ আছে। তবে আমরা ধারণা করছি, তারা মারা গেছেন।
লন্ডনে দিন কয়েকের ব্যবধানে তিন দফায় ভবনে আগুন লাগা ও কয়েক দফায় জঙ্গি হামলার ঘটনায় ব্রিটেনে বিশেষত অভিবাসী কমিউনিটির মধ্যে এখনও উদ্বেগ উৎকণ্ঠা কাটছে না। বিশেষত জঙ্গি হামলার জের ধরে বিলেতে মুসলমানদের ওপর হেইট ক্রাইম বা বর্ণবাদী হামলা বেড়েছে আশঙ্কাজনকভাবে। গত সপ্তাহে বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব লন্ডনে চলন্ত গাড়িতে ছোড়া এসিডে ঝলছে গেছে রিসাম খান নামে একুশ বছর বয়সী তরুণীর মুখ। ব্রিটেনের বিভিন্ন স্থানে বর্ণবাদী হামলার ঘটনা স্বীকার করেছে পুলিশও। বাংলাদেশি কমিউনিটিও স্বভাবতই উদ্বিগ্ন।