বৃহস্পতিবার, ২৯ জুন, ২০১৭

আবগারি শুল্ক কমেছে নতুন ভ্যাট আইন স্থগিত

আজকাল রিপোর্ট:ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসেবে আবগারি শুল্ক কমেছে। একই সঙ্গে নতুন মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট/মূসক) আইন কার্যকর হচ্ছে না। বর্তমানে প্রযোজ্য আইনে ভ্যাট আদায় করা হবে। মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইন-২০১২ আগামী ২ বছরের জন্য স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অনুরোধের পর অর্থমন্ত্রী তার সমাপনী বাজেট আলোচনায় এ ঘোষণা দেন। পরে অর্থ বিল-২০১৭ পাসের মধ্য দিয়ে এসব ঘোষণার আইনি ভিত্তি পায়। বিল পাসের পর এখন ১ লাখ টাকা পর্যন্ত কোনো শুল্ক দিতে হবে না। ১ লাখ ১ টাকা থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দিতে হবে ১৫০ টাকা। ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ পর্যন্ত ৫০০ টাকা। ১০ লাখ থেকে ১ কোটি পর্যন্ত দিতে হবে ২ হাজার ৫০০ টাকা। ১ কোটি থেকে ৫ কোটি পর্যন্ত ১২ হাজার টাকা ও ৫ কোটির ঊর্ধ্বে দিতে হবে ২৫ হাজার টাকা।


এদিকে সমাপনী বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, বাজেট উপস্থাপনের প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সব দৃষ্টি নিবদ্ধ হয় দু-চারটি শুল্ক বা কর হারে বৃদ্ধির প্রস্তাবাবলীর ওপর। ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাবের ওপর শুল্ক বৃদ্ধি ছিল একটি বিতর্কের বিষয়। অনেক এমপি এবং গণমাধ্যম ভুলেই গিয়েছিলেন যে, এই শুল্কটি ২০০২ সাল থেকে দেয়া হচ্ছে। কেউ কেউ বলেছেন, এই বাজেটটি একটি শ্রেষ্ঠ তামাশা। মূল্য সংযোজন কর নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়েছে। এই আইন এদেশে প্রবর্তিত হয় ১৯৯১ সালে। সেটা পুরোপুরি সংশোধন করে একটি খসড়া ২০০৮ সালেই প্রস্তুত হয়। আমরা এই আইন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা, ডায়ালগ, বিতর্ক ইত্যাদি অনুষ্ঠান করে ২০১২ সালে আইনটি পাস করি। তবে বলে দিই, এটি কার্যকরী হবে ২০১৬ সালে। ২০১৬ সালে এর কার্যকারিতা আরো এক বছর পিছিয়ে দেয়া হলো। কিন্তু তাতেও মনে হয় করদাতাদের আমরা সন্তুষ্ট করতে পারিনি।

তিনি বলেন, এবারের বাজেট ঘোষণার পর দেশের সর্বস্তরে এর পক্ষে-বিপক্ষে যেভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা হয়েছে, তা আমার কাছে ইতিবাচক মনে হয়েছে। আমাদের সরকার জনগণের সরকার। আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপের ওপর জনগণের মতামত সঠিক পথে চলার নির্দেশনা দেয়। বাজেটে প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমরা প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি ৭ দশমিক ৪ শতাংশ। এটি অর্জনের বিষয়ে কেউ কেউ সংশয় প্রকাশ করেছেন। ২০১৫-১৬ সালে আমাদের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ০৫ শতাংশ। এর বিপরীতে আমরা ৭ দশমিক ১১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছিলাম। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমাদের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২ শতাংশ। এর বিপরীতে বিবিএসের সাময়িক হিসাবে আমাদের প্রবৃদ্ধি এসেছে ৭ দশমিক ২৪ শতাংশ। তার মানে হচ্ছে, আমরা বিগত ২ বছর ধরে আমাদের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করে চলেছি। এ ধারা সামনের দিনগুলোতে অব্যাহত থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমাদের প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তির অন্তর্ভুক্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর সাম্প্রতিক ইতিবাচক পরিবর্তন আমার এই দাবির সপক্ষেই সাক্ষ্য দিচ্ছে।

খাতভিত্তিক প্রবৃদ্ধি তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের এপ্রিল নাগাদ আমদানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং একই অর্থবছরের মে নাগাদ রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের এপ্রিল মাসে ব্যক্তি খাতে ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ২১ শতাংশ, যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। প্রবাস আয়প্রবাহ নিয়ে আমরা কিছুটা উদ্বেগের মধ্যে ছিলাম। তবে প্রবাস আয়প্রবাহ সম্প্রতি ঘুরে দাঁড়িয়েছে। চলতি অর্থবছরের মে মাসে আমাদের প্রবাস আয় বৃদ্ধি পেয়েছে ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশ, যা বিগত অর্থবছরে একই সময়ে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছিল। এ পর্যন্ত প্রাপ্ত (মে, ২০১৭) তথ্য অনুযায়ী চলতি অর্থবছরে মোট ৮ লাখ ৩৭ হাজার প্রবাসী নিয়োগ হয়েছে, যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৬ লাখ ২২ হাজার। প্রবাসী আয় বৃদ্ধির বিস্তারিত কর্মকৌশল আমি বাজেট বক্তৃতায় বলেছি। আশা করি, প্রবাসী আয়কে ঘিরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির অনিশ্চয়তা অচিরেই দূর হবে।

অর্থমন্ত্রী বলেন, প্রবৃদ্ধি নির্দেশক অন্যান্য চলকগুলোর মধ্যে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের উৎপাদন সূচক বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষভাবে ম্যানুফেকচারিং ও মাইনিং খাতের উৎপাদন সূচক চলতি অর্থবছরে ডিসেম্বর নাগাদ ৭ দশমিক ৪১ শতাংশ ও ২ দশমিক ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আপনি অবগত আছেন, ব্যাংক ব্যবস্থায় সুদের হার ও হার ব্যবধান অব্যাহতভাবে হ্রাস পাচ্ছে। এতে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। আবার চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে নিট সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ। মূলত দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় থাকা, নীতি-কৌশলগুলোর ধারাবাহিকতা রক্ষা ও এগুলোর সুসমন্বিত প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠার অব্যাহত সরকারি উদ্যোগ ইত্যাদির প্রভাবে ব্যবসায়ী বা বিনিয়োগকারীসহ সব স্তরের জনগণ দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে ক্রমেই আশাবাদী হয়ে উঠেছেন যা ব্যক্তি খাতের বিনিয়োগ বৃদ্ধির পথকে প্রশস্ত করেছে। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে সময়ে এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছে ৬৪ দশমিক ৭২ শতাংশ, যা বিগত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ৬১ দশমিক ৮৫ শতাংশ। এটি সরকারি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে। পাশাপাশি বিনিময় হার বিগত বছরের জুন মাসের তুলনায় চলতি অর্থবছরের জুন মাসে ২ দশমিক ৭ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে যা দেশের রফতানি খাতকে উজ্জীবিত করবে। সর্বোপরি স্বস্তিদায়ক বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ, লেনদেন ভারসাম্যে অনুকূল অবস্থান, ক্রমহ্রাসমান মূল্যস্ফীতি, সরকারের প্রাজ্ঞ রাজস্বনীতির পাশাপাশি সহায়ক মুদ্রানীতির অনুসরণ ইত্যাদির কারণে দীর্ঘদিন ধরে দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রয়েছে। এটি টেকসই উচ্চ প্রবৃদ্ধির জন্য একটি আবশ্যকীয় পূর্বশর্ত। এখানে আমি বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই যে, আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে জিডিপির ৭ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধির অর্জনে আমরা মোট বিনিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি জিডিপির ৩১ দশমিক ৯ শতাংশ যা আমাদের ওহপৎবসবহঃধষ ঈধঢ়রঃধষ ঙঁঃঢ়ঁৎ জধঃরড় (৪.২) বিবেচনায় কাক্সিক্ষত মোট বিনিয়োগ ৩১ দশমিক ০৮ শতাংশের চেয়ে বেশি। এসব বিষয় বিবেচনায়, আমার বিশ্বাস আগামী ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আমাদের প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আমরা অর্জন করতে সক্ষম হব।

কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি: অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের উচ্চ প্রবৃদ্ধি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে না মর্মে অনেকেই মত প্রকাশ করেছেন। এ বিষয়ে আমি বাজেট বক্তৃতায় আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ও কৌশল সম্পর্কে বলেছি। এ কথা সত্য, ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার পর বিশ্বব্যাপী কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি হয়েছে। তবে এটি আমাদের দেশে পরিলক্ষিত হয়নি। সম্প্রতি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ত্রৈমাসিক শ্রমজরিপ ২০১৫-১৬ প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশের বেকারত্বের হার ২০১৩ সালের ৪.৩ শতাংশ হতে ২০১৫-১৬ সালের শেষ প্রান্তিকে ৪.০ শতাংশে নেমে এসেছে, যা যে কোনো বিচারে উল্লেখ করার মতো। কর্মসংস্থান সঞ্চারি প্রবৃদ্ধি না হলে বেকারত্বের হার কমা সম্ভব হতো না। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এখন কাঠামোগত পরিবর্তন হচ্ছে। এ জন্য কৃষি থেকে শ্রমশক্তি শিল্প ও সেবা খাতে স্থানান্তরিত হচ্ছে।

বিনিয়োগ বৃদ্ধি: উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধিকে সচল রাখার বিষয়ে আমরা বরাবরের মতো এ বাজেটে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছি। বিশেষ করে বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে এ যাবৎ কালের সর্ববৃহৎ বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রস্তাব করেছি। গণ-অবকাঠামো এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে একদিকে শিল্পায়নের প্রসার ঘটবে। অন্যদিকে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ চাহিদাও গতিশীল থাকবে। পর্যায়ক্রমে আমরা শিল্প স্থাপনের বাধাসমূহ দূরীকরণে বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছি। এসব পদক্ষেপের মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন, পিপিপির দক্ষ ও গতিশীল আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি, বেসরকারি বিনিয়োগ অর্থায়নে ফান্ড স্থাপন ইত্যাদি প্রণিধানযোগ্য। এ ছাড়া বিদেশি বিনিয়োগে বাধা অপসারণে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (ইওউঅ) ওয়ান-স্টপ সার্ভিসসহ বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। আমি আশা করি এসব চলমান উদ্যোগসমূহ পরিপূর্ণরূপে বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের উন্নয়ন আকাক্সক্ষা পূরণে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি সাধিত হবে। আমাদের মনে রাখা দরকার যে, গত বছরে যুদ্ধোত্তরকালে সর্বপ্রথম বিশ্ববাণিজ্যের প্রসারের হারের চেয়ে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার হয়েছে সামান্য বেশি। তাই বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি দুটি বিষয়ে বিশেষ নজর দিতে হবে।

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার: সঞ্চয়পত্রের সুদের হার কমানোর বিষয়ে বাজেট বক্তৃতায় আমি কোনো প্রস্তাব রাখিনি। চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র খাত থেকে আমাদের নিট ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা যেখানে এপ্রিল, ২০১৭ পর্যন্ত বিক্রি হয়েছে ৪২ হাজার ৯৮ কোটি টাকা। মূলত ব্যাংক ব্যবস্থায় সুদের হার কমার কারণে সঞ্চয়পত্রের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় সঞ্চয়পত্র হতে অধিক ঋণ গ্রহণ করতে হচ্ছে। ফলে সুদ বাবদ ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে যা সরকারের ব্যয় ব্যবস্থাপনার ওপর একটি বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করছে। এই বাস্তবতার বিষয়টি আমি বিভিন্ন ফোরামে উত্থাপন করেছি। একটি বিষয় আমি আপনার মাধ্যমে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করতে চাই। জাতীয় সঞ্চয়পত্রের সুদের হার নির্ধারণের কারণে কোনো পেনশনভোগী, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত কেউ যাতে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়টি আমাদের সক্রিয় বিবেচনায় রয়েছে। আপনার মাধ্যমে আরো একটি বিষয় আমি দেশবাসীকে জানাতে চাই যে, অনন্তকালের জন্য সঞ্চয়পত্রের সুদের হার নির্দিষ্ট থাকতে পারে না। 

সুদের হারের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে, মূল্যস্ফীতি বাড়লে সুদের হার বাড়ে আর মূল্যস্ফীতি কমলে সুদের হার কমে। বিষয়টি তাই আমাদের পুনর্বিবেচনা করতে হবে। তবে আমরা চাচ্ছি সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে যে সামাজিক নিরাপত্তা সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে, তা যেন সঠিক ব্যক্তিরা পায়। এ জন্য আমরা এর একটি পূর্ণাঙ্গ তথ্যভাণ্ডার তৈরি করব যেখানে ক্রেতার জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে সঞ্চয়পত্রের তথ্যকে সম্পৃক্ত করা হবে। পাশাপাশি আর্থিক বাজারকে আধুনিকীকরণে আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে যাতে মানুষ বিনিয়োগের বিকল্প মাধ্যম খুঁজে পায়। এ ছাড়া এবারের বাজেটে একটি গুরুত্বপূর্ণ জনসুরক্ষার বিষয় উল্লেখ করেছি। আপনি জানেন সরকারি কর্মচারীরা পেনশন সুবিধা পেয়ে থাকেন। আমরা পেনশন সুবিধা সর্বস্তরের জনগণের জন্য বিস্তৃত করতে চাই। এ অর্থবছরেই আমরা সর্বজনীন পেনশনের প্রাথমিক কাজ শুরুর পরিকল্পনা করেছি যাতে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠী পেনশন সুরক্ষার আওতাভুক্ত হতে পারেন।
উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা বনাম বাস্তবায়ন সক্ষমতা বিষয়ক বিতর্ক: অর্থমন্ত্রী বলেন, আমাদের বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে। সক্ষমতা বিবেচনায় বাজেটটি হয়েছে অতি উচ্চাভিলাষী- এরূপ মতামতও ব্যক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বিষয়ে অনেকেই সংশয় প্রকাশ করেছেন। আমি এসব আলোচনা-সমালোচনাকে সব সময়ই স্বাগত জানাই। ইতিবাচক আলোচনাগুলো আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগায়, একই সঙ্গে আরো বাস্তবসম্মত ও সময়ানুগ বাজেট প্রণয়নে দিকনির্দেশনা প্রদান করে। আপনি লক্ষ্য করবেন, আমাদের বিগত বছরগুলোর বাজেটের পরও একই সমালোচনা করা হয়েছে। রূপকল্প অনুযায়ী ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ ও ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে পরিণত হওয়ার লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের বাজেটের আকার ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করতে হবে। কাজেই আমাদের বাজেট কিছুটা উচ্চাভিলাষী হবে সেটাই স্বাভাবিক।

মূল্য সংযোজন কর একটি উত্তম পন্থা: অর্থমন্ত্রী বলেন, কর আরোপ প্রক্রিয়ার মূল্য সংযোজন কর একটি উত্তম পন্থা এ কথা আমি আগেই বলেছি। ১৯৯১ সালে প্রণীত মূল্য সংযোজন কর আইনটি বহু সংশোধনীর পর অফলপ্রসূ হয়ে পড়ায় ২০০৮ সালেই একটি নতুন মূসক আইন প্রণীত হয়। এইটি নিয়ে প্রায় চার বছর আমরা নানা আলোচনা বিতর্ক চালিয়ে যাই। অবশেষে ২০১২ সালে আমরা নতুন আইন প্রণয়ন করি, যা এই মহান সংসদে পাস হয়। এই আইনটির কার্যকারিতা কিন্তু ধাপে ধাপে বাড়ানো হয়েছে। এ বছর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পূর্বপ্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে বিধায় এ বারের বাজেটে আইনটি কার্যকর করার প্রস্তাব করা হয়েছিল। এ বিষয়ে মাননীয় সংসদ সদস্যরা তাদের প্রাজ্ঞ মতামত দিয়েছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও এই বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। এই প্রেক্ষিতে আমি মূসক আইনের পূর্ণ কার্যকারিতা পিছিয়ে দেয়ার প্রস্তাব করছি। আগের ধারাবাহিকতায় কিছু সংশোধন করে ২০১২ সালের আইনই যেভাবে গত চার বছর ধরে পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়িত হচ্ছে, ঠিক তেমনিভাবে আমাদের বর্তমান সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। 

তিনি বলেন, এই বাজেটটি আমার একাদশতম বাজেট এবং আমি বলেছিলাম যে এইটি হবে আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ বাজেট। বাজেট প্রস্তাব প্রথমে মন্ত্রিসভা পাস করে ১ জুনে; অতপর সেদিনই অপরাহ্নে এই বাজেট প্রস্তাব সংসদে পেশ হয়। সুদীর্ঘ আলোচনা ও বিতর্কের পর বাজেটটিকে নানাভাবে সমৃদ্ধিশালী ও জনবান্ধব করে আজকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন ও পরামর্শ গ্রহণ করে যেভাবে এটি প্রস্তাবিত হয়েছে তাতে সত্যিই দাবি করছি যে, এটি একটি উত্তম বাজেট প্রস্তাব, আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম বাজেট। অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি আমার বক্তব্য এই বলে শেষ করতে চাই যে, বিগত এক দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যে অভাবনীয় অগ্রগতি সাধিত হয়েছে তার পেছনে রয়েছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রাজ্ঞ ও দূরদর্শী উন্নয়নের দর্শন। তার রচিত উন্নয়নের রূপকল্প দেশের আপামর মানুষের মনে সৃষ্টি করেছে এক অসাধারণ আত্মপ্রত্যয়। উন্নয়নের মহাসড়কে আজ আমাদের দৃপ্ত চারণায় সচকিত বিশ্ববাসী। আমাদের অগ্রগতির এ মহাযজ্ঞে দেশের সব মানুষই গর্বিত অংশীদার। দেশকে উন্নত করতে হলে আমাদেরও একইভাবে ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে উঠে উন্নত ও সমৃদ্ধ দেশ গঠনের মাধ্যমে জাতির জনকের স্বপ্নপূরণে আত্মনিয়োগ করতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রয়াসে একটি সমৃদ্ধ, উন্নত, সুখী ও শান্তিময় বাংলাদেশ বিনির্মাণে বর্তমান সরকার সফল হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন অর্থমন্ত্রী।

সূত্র:মানবকণ্ঠ