রবিবার, ১৮ জুন, ২০১৭

মালয়েশিয়ায় অভিবাসন ব্যয় বৃদ্ধিঃ ৩৭,০০০ থেকে বাড়িয়ে ১,৬০,০০০

আজকাল ডেস্কঃ জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী অভিবাসনে জনপ্রতি ব্যয় বাড়ছে এক ধাক্কায় সাড়ে চার গুণ। জনশক্তি রফতানিকারকদের দাবি আমলে নিয়ে সরকার এ ব্যয়বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে বলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য প্রাথমিকভাবে ব্যয় নির্ধারণ করে জনপ্রতি ৩৭ হাজার ৫৭৫ টাকা। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) ভিত্তিতে এটি নির্ধারিত হয়। বর্তমানে এ ব্যয় বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। অর্থাত্ জিটুজি প্লাসের আওতায় মালয়েশিয়া যেতে অভিবাসন প্রত্যাশীদের ব্যয় বাড়ছে প্রায় সাড়ে চার গুণ।

বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে দেশভেদে আরোপিত সার্ভিস চার্জ ও অভিবাসন ব্যয়সীমা বেঁধে দিয়ে ১৪ জুন একটি সরকারি আদেশ জারি করে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের উপসচিব মো. আবুল হাছানাত হুমায়ুন কবীর স্বাক্ষরিত ওই আদেশে মালয়েশিয়ায় অভিবাসী পাঠানোর ক্ষেত্রে এ সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা নির্ধারণের কথা জানানো হয়। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মালয়েশিয়ার নির্মাণ ও উৎপাদন খাতে কর্মী গমনে ব্যয় হবে জনপ্রতি ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা। অন্যদিকে দেশটির কৃষি খাতের জন্য কর্মী অভিবাসনের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে জনপ্রতি ১ লাখ ৪০ হাজার টাকা। আগে উভয় খাতেই কর্মী অভিবাসনের ব্যয় ছিল সমান তথা জনপ্রতি ৩৭ হাজার ৫৭৫ টাকা।
সরকারি আদেশে একই সঙ্গে আরো ১৩টি দেশেও সর্বোচ্চ অভিবাসন ব্যয়সীমা বেঁধে দেয়া হয়। অন্য ১৩টি দেশের মধ্যে লিবিয়ায় শ্রমিক পাঠানোর ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ অভিবাসন ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৭৮০ টাকা। এছাড়া বাহরাইনে ৯৭ হাজার ৭৮০ টাকা, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ১ লাখ ৭ হাজার ৭৮০, কুয়েতে ১ লাখ ৬ হাজার ৭৮০, ওমানে ১ লাখ ৭৮০, ইরাকে ১ লাখ ২৯ হাজার ৫৪০, কাতারে ১ লাখ ৭৮০, জর্ডানে ১ লাখ ২ হাজার ৭৮০, মিসরে ১ লাখ ২০ হাজার ৮০, রাশিয়ায় ১ লাখ ৬৬ হাজার ৬৪০, মালদ্বীপে ১ লাখ ১৫ হাজার ৭৮০, ব্রুনাই দারুস সালামে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৮০ ও লেবাননে ১ লাখ ১৭ হাজার ৭৮০ টাকা অভিবাসন ব্যয় নির্ধারণ করার কথা জানানো হয়।
নতুন আদেশ অনুযায়ী, বিদেশগামী কর্মীর কাছ থেকে সার্ভিস চার্জসহ পুরো অর্থই চেক বা ব্যাংক ড্রাফট অথবা পে-অর্ডারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সির অফিশিয়াল ব্যাংক অ্যাকাউন্টে গ্রহণ করতে হবে। আর এ সময় কর্মীকে প্রাপ্তি স্বীকার রসিদ দিতে হবে। একই সঙ্গে নির্ধারিত অভিবাসন ব্যয়ের অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হলে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও অভিবাসী আইন ২০১৩ অনুযায়ী আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও আদেশে জানানো হয়।
তবে মালয়েশিয়ার ক্ষেত্রে ব্যয়বৃদ্ধির এ সিদ্ধান্ত কার্যকর হচ্ছে না এখনই। এমওইউয়ের অনুচ্ছেদ ৯ অনুযায়ী জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের পরবর্তী সভায় মালয়েশীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনাসাপেক্ষে নির্ধারিত নতুন অভিবাসন ব্যয় চূড়ান্ত করা হবে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।
জনশক্তি রফতানিকারকদের দাবি আমলে নিয়ে এ ব্যয়বৃদ্ধির অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (প্রশাসন) জাবেদ আহমেদ বলেন, কোনো পক্ষের চাপের কারণে অভিবাসন ব্যয় বাড়ানো হয়নি। আগে যে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল, তা বাংলাদেশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। যে কারণে রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো কর্মীদের সঙ্গে বিভিন্ন প্রতারণার আশ্রয় নিত। এছাড়া শুধু জিটুজি প্রক্রিয়ায় শ্রমিক রফতানির ক্ষেত্রে আগের ব্যয়টি নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু জিটুজি প্লাসের ক্ষেত্রে উভয় দেশের ব্যবসায়ীরা সম্পৃক্ত। এ কারণে খরচ বেড়েছে।
প্রসঙ্গত, আগে থেকেই জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর ব্যয় পাঁচ গুণ বাড়ানোর দাবি জানিয়ে আসছিল জনশক্তি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজ (বায়রা)। এক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত বর্তমান ব্যয়ে কর্মী পাঠানো সম্ভব নয় বলে যুক্তি দিয়ে আসছিল সংগঠনটি। এজন্য উৎপাদন ও অবকাঠামো খাতে জনপ্রতি ১ লাখ ৭৮ হাজার এবং বনায়ন খাতে জনপ্রতি ১ লাখ ৫৫ হাজার টাকা করে ব্যয় নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছিল বায়রা। এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে একটি প্রস্তাবনাও পাঠিয়েছিল সংগঠনটি।
জিটুজি প্লাস পদ্ধতিতে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানি শুরু হওয়ার পর থেকেই রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর বিরুদ্ধে অভিবাসন প্রত্যাশীদের কাছ থেকে এ বাবদ নির্ধারিত ব্যয়ের অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ ওঠে। এ বিষয়ে বায়রার বক্তব্য হলো, সরকার নির্ধারিত খরচে কর্মী পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না বলেই এজেন্সিগুলো বেশি করে টাকা নিতে বাধ্য হচ্ছে।
বিষয়টি নিয়ে বায়রা সভাপতি বেনজির আহমেদ বলেন, ‘যেখানে উড়োজাহাজের ভাড়াই লাগে ৩৪ হাজার টাকা, সেখানে সাড়ে ৩৭ হাজার টাকায় কর্মী পাঠানো সম্ভব নয়। এ কারণে এজেন্সিগুলো সরকার নির্ধারিত ব্যয় মানতে পারছে না। এজেন্সিগুলো যাতে সরকার নির্ধারিত ব্যয় মেনে চলতে পারে, সেজন্য আমরা মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর খরচ পুনর্নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছিলাম।’
বর্তমানে জনশক্তি রফতানি খাতে শ্রমিক অভিবাসনের ব্যয় নিয়ন্ত্রণে দেশভেদে ভিন্ন ভিন্ন সর্বোচ্চ অভিবাসন ব্যয়সীমা বেঁধে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ ব্যয় নির্ধারণের ক্ষেত্রে দেশগুলোয় একজন কর্মীর তিন-পাঁচ মাসের বেতনের সমপরিমাণ অর্থকে সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে বলে জানা গেছে।