বুধবার, ১০ মে, ২০১৭

আখালিয়ায় পুত্রকে বন্দি রেখে জমি রেজিস্ট্রি

আজকাল ডেস্কঃসিলেট নগরীর আখালিয়া এলাকায় পুত্রকে অপহরণ করে পিতার কাছ থেকে জোরপূর্বক জমি রেজিস্ট্রি করার অভিযোগ উঠেছে  হাজী সেলিম আহমদ নামে এক আওয়ামী লীগ নেতার বিরুদ্ধে। জানা যায় জমি রেজিস্ট্রি করার জন্য জমির মালিকের ছেলেকে অপহরন করা হয় এবং জমি রেজিশ্ত্রির পর ছেড়ে দেয়া হয় তাকে। এরপর টাকা চাওয়া হলে ভূমির মালিককে আখালিয়া নতুন বাজার এলাকায় একটি কক্ষে নিয়ে মারধরও করা হয়েছে।
 ঘটনার পর স্থানীয়ভাবে বিচার চেয়ে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে গতকাল সিলেটের মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলা করেছেন ভূমির মালিক সোহেদ আহমদ চৌধুরী সোহেল। এর আগে তাকে হুমকি দেয়া ও জোরপূর্বক ভূমি রেজিস্ট্রির ঘটনায় তিনি সিলেটের কোতোয়ালি থানায় জিডিও করেছিলেন। আদালত গতকাল মামলাটি আমলে নিয়ে সিলেটের পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন- পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
ভূমির মালিক সিলেটের আখালিয়া বড়বাড়ির সোহেদ আহমদ চৌধুরী সোহেল। আর মামলায় অভিযুক্তরা হচ্ছে- আখালিয়া নতুনবাজারের মুসলিম নগরের মৃত চুনু মিয়ার ছেলে হাজী সেলিম আহমদ, একই এলাকার মৃত বুলু মিয়ার ছেলে ইরান আহমদ ড্রাগন, মৃত সুনু মিয়ার ছেলে আবদুল মালেক,  হাওলাদারপাড়ার বিপ্লব ও শামীমাবাদ আবাসিক এলাকার আরিফ প্লেসের বাসিন্দা ও আমেরিকা প্রবাসী মরহুম হাজী আবদুল করিমের ছেলে মো. ইসলাম উদ্দিন। ঘটনা গত ২৭শে এপ্রিলের। সিলেট শহরতলীর ঘোপালের গোপালস্থ ২২ শত ভূমি রয়েছে মামলার বাদী চৌধুরী সোহেলের। গত জানুয়ারি মাসে তিনি ওই জমি ক্রয় করেছিলেন।



 কিন্তু জমি ক্রয়ের পরপরই তিনি আর্থিকভাবে অনটনে পড়েন। এরপরই তিনি জমি বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজতে থাকেন। এমনকি জমি বিক্রির জন্য তিনি সিলেটের আঞ্চলিক পত্রিকায় বেশ কয়েকবার বিজ্ঞাপন দেন। আর এই বিজ্ঞাপনটি চোখে পড়ে আখালিয়া নতুন বাজারের বাসিন্দা ও মামলার প্রধান আসামি হাজী সেলিমের চাচাতো ভাই আবদুল মালেকের। এ কারণে জমিটি বিক্রি করে দিতে আবদুল মালেক তার চাচাত ভাই হাজী সেলিমের কাছে নিয়ে যান। হাজী সেলিম আহমদ আখালিয়া এলাকায় বহুল পরিচিত। আগে তিনি নিজেকে বিএনপি নেতা বলে পরিচয় দিলেও এখন এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে পরিচিত। ওই এলাকায় তার সাদী ট্রেড সেন্টার নামে এক কার্যালয় রয়েছে। আর ওই ট্রেড সেন্টারে তিনি নিজে বসেন এবং জমি কেনাবেচা করেন। জমির ব্যবসায়ী হিসেবে এলাকায় হাজী সেলিমের হাঁকডাক রয়েছে। এদিকে- হাজী সেলিমের কাছে নিয়ে যাওয়ার পর তিনি জমিটি বিক্রি করে দেবেন বলে আশ্বাস দেন। পরে হাজী সেলিমের পরামর্শ মতো ফের সিলেটের স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় আবারও বিজ্ঞাপন দেয়া হয়। এরই মধ্যে হাজী সেলিমেরই ঘনিষ্ঠজন মামলার দুই নম্বর আসামি ইরান আহমদ ড্রাগনের নামে ২০ শতক জমির বায়নামাপত্র সম্পাদন করা হয়। বায়নামাপত্রে জমির মূল্য ধরা হয় ৩২ লাখ টাকা। বায়নামাপত্রে নগদ ৫ লাখ টাকা প্রদানের কথাও উল্লেখ করা হয়। এদিকে- বায়নামা পত্র সম্পাদনের পর হাজী সেলিম আহমদ, ইরান আহমদ ড্রাগন, আবদুল মালেক ও বিপ্লব এই চারজন মিলে আমেরিকা প্রবাসী ও নগরীর শামীমাবাদ এলাকার বাসিন্দা ইসলামউদ্দিনের কাছে জমি বিক্রির কথা বার্তা চূড়ান্ত করেন। জমি রেজিস্ট্রির তারিখ নির্ধারণ করা হয় ২৭ এপ্রিল। কিন্তু ওই সময় হাজী সেলিম জমির প্রকৃত মালিক চৌধুরী সোহেলকে জানান- জমি রেজিস্ট্রির দুই দিন পর প্রবাসী ইসলামউদ্দিন টাকা দেবেন। এ কারণে জমি রেজিস্ট্রির দুইদিন পর টাকা নিতে হবে। এতে রাজি হননি চৌধুরী সোহেল। তিনি বলেন- জমি যেদিন রেজিস্ট্রি করা হবে সেই দিনই টাকা প্রদান করতে হবে। অন্যথায় তিনি জমি রেজিস্ট্রি করে দেবেন না। এদিকে- জমি রেজিস্ট্রির দিন সকাল সাড়ে ৯ টার দিকে চৌধুরী সোহেলের ৯ম শ্রেণি পড়ুয়া পুত্র ইসতিয়াক চৌধুরী রোহান বাজারের উদ্দেশ্যে মদিনা মার্কেট যাচ্ছিল। স্থানীয় এলাকার পুকুরপাড়ে আসামাত্র হাজী সেলিমের নিজের গাড়িতে ইরান আহমদ ড্রাগন, আব্দুল মালেক ও বিপ্লব জোরপূর্বক তাকে গাড়িতে তুলে নেয়। এরপর তারা মালেকের বাড়িতে নিয়ে গিয়ে রোহানকে একটি ঘরে বন্দি রাখে। এ সময় তার মুখ বেঁধে রাখা হয়। আর রোহানকে অপহরণের পর চৌধুরী সোহেলকে বাড়ি থেকে ডেকে নেন নিজ কার্যালয়ে। এরপর ওখানে তার কাছ থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে বলা হয়- যদি জমি রেজিস্ট্রি করে না দেয়া হয় তাহলে ছেলেকে পাবে না। ছেলের কথা শুনে তটস্থ হয়ে পড়েন চৌধুরী সোহেল। তিনি ছেলেকে ছেড়ে দেয়ার অনুরোধ জানিয়ে বলেন- আপনারা যা বলবেন তাই করবো। আমার ছেলেকে ছেড়ে দেন। মামলার অভিযোগে চৌধুরী সোহেল জানিয়েছেন- ছেলেকে অপহরণ করে বন্দি রাখার পর তিনি হাজী সেলিম ও তার সহযোগীদের সঙ্গে রেজিস্ট্রি অফিসে চলে আসেন। সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পাসের হোটেল শাবানের একটি কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয় চৌধুরী সোহেলকে। সেখানে দলিল লেখক শাহীন সহ কয়েকজন এসে জমি রেজিস্ট্রির কাগজে তার স্বাক্ষর নেন। পরে তাকে হুমকি দিয়ে বলা হয়- সাব-রেজিস্ট্রারের সামনে গিয়ে বলতে হবে টাকা পেয়ে গেছো। আর ওদিকে দলিলে স্বাক্ষর নেয়ার পর বন্দি রাখা ছেলে রোহানকে ছেড়ে দেয়া হয়। রোহান বাড়ি চলে যায়। আমেরিকা প্রবাসী ইসলাম উদ্দিনের নামেই জমি রেজিস্ট্রি করা হয়। চৌধুরী সোহেল জানান- হাজী সেলিমসহ অন্যরা ৪০ লাখ টাকার বিনিময়ে ওই জমি বিক্রি করে পুরো টাকাই লুটে নিয়েছে। আর তারা এমনভাবে নাটক সাজিয়েছে ঘটনাটি ফিল্মি স্টাইলকে হার মানিয়েছে। এরপর হাজী সেলিম ও অন্যদের কাছে টাকা চাইতে গেলে তারা সাদী ট্রেড সেন্টারের ভেতরে নিয়ে গিয়ে তাকেও মারধর করেন বলে জানিয়েছেন চৌধুরী সোহেল। এদিকে- এ ঘটনার পর সিলেটের কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারন ডায়েরি করেছেন চৌধুরী সোহেল। ওই ডায়েরিতে তিনি বলেন- ২২ শতক ভূমি রেজিস্ট্রির করার জন্য জিম্মি অবস্থায় তাকে সিলেট সদর সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে নিয়ে আসা হয়। এরপর ভূমি বিক্রয়ের টাকা আত্মসাৎ করতে চৌধুরী সোহেল ও তার পরিবারকে প্রতিনিয়ত হুমকি দেয়া হচ্ছে। কোতোয়ালি থানা পুলিশ জিডি গ্রহন করলেও গতকাল পর্যন্ত তদন্তে যায়নি বলে জানান সুহেল। এর প্রেক্ষিতে তিনি গতকাল সিলেটের চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সাইদুজ্জামান হিরোর আদালতে এ মামলা দায়ের করেন। মামলা নং (সিআর ৬১৫/২০১৭)। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন চৌধুরী সোহেলের আইনজীবী এডভোকেট লোকমান আহমদ চৌধুরী। তিনি জানান- ঘটনাটি খুবই স্পর্শকাতর। এ কারণে সঠিক তদন্তের জন্য আমরা পিবিআইতে মামলা দেয়ার জন্য আদালতে অনুরোধ জানাই। এই অনুরোধের প্রেক্ষিতে পিবিআই মামলাটি তদন্ত করে রিপোর্ট আদালতে দাখিল করবে। এর আগে গত শনিবার রাতে হোটেল গুলশানের ৩১৩ নম্বর কক্ষে সমঝোতা বৈঠকের জন্য বাদীকে ডাকেন হাজী সেলিম আহমদের ছোটো ভাই জুয়েল আহমদ। ওখানে বৈঠক হলেও জুয়েল আহমদ পাওনা টাকা উদ্ধারের ব্যাপারে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি। এদিকে- গতকাল সিলেটের আখালিয়া এলাকার যুবলীগ নেতা সাহেদ আহমদ জানিয়েছেন- পাওনা টাকা আদায়ের জন্য তিনি নিজেও হাজী সেলিমের সঙ্গে কথা বলছিলেন। কিন্তু হাজী সেলিম টাকা দেয়ার ব্যাপারে কোনো কর্ণপাত করেননি। তবে সেলিম তার কাছে টাকা পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানান, সাহেদ আহমদ। অভিযোগ প্রসঙ্গে হাজী সেলিম আহমদ বলেন তিনি কোনো অপহরণের ঘটনা ঘটাননি। চৌধুরী সোহেলের জমি অন্যরা দখল করে নিয়েছিল। তিনি নিজে ওই জমি উদ্ধার করেন। তবে- তিনি বলেন, জমি রেজিস্ট্রির পর ঘোপালে যাদের দিয়ে জমি উদ্ধার করা হয়েছিল তাদের ১২ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে। আর ১৭ লাখ টাকা চৌধুরী সোহেলের হাতে তুলে দেয়া হয়েছে। জমি রেজিস্ট্রির সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন বলে জানান।