রবিবার, ১ জানুয়ারী, ২০১৭

বিদায়ী বছরটি ছিল উন্নয়ন ও মেগা প্রকল্পের

সিলেট আজকাল : যে আশা আকাঙ্খা উন্নয়ন ও পরাধীনতা থেকে মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে ৪৫ বছর পূর্বে  বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্ম হয়েছিল  সেই স্বপ্নের অনেক অংশই বিদায়ী বছরে চোখের সামনে বাস্তবায়িত হতে দেখেছে বাংলাদেশের মানুষ। উন্নত স্বাধীন রাষ্ট্রের বাসিন্দা হওয়ার সেই স্বপ্ন পূরণে নানা মেগা উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ  বাস্তবায়ন, উদ্বোধন- সবই ঘটেছে বছরটিতে। তাই বিদায়ী বছরটিকে মেগা প্রকল্পের বছর বলতেই  স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছেন বিশ্লেষকরা।  
বিগত দিনগুলোতে নানা বঞ্চনায় উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্নটি ভেঙ্গে গিয়েছিল বাংলাদেশের মানুষের। সেই স্বপ্নের বাস্তব রূপ দেয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকার। জনগণের আস্থার প্রতিদান দিতে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। হাতে নেন অনেকগুলো বৃহৎ আকারের উন্নয়ন প্রকল্প যেগুলোকে মেগা প্রকল্প হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। 

 
এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই বাস্তবায়নাধীন, যেগুলোর তদারকি প্রধানমন্ত্রী নিজেই করছেন। গত আট বছরের মধ্যে এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন সবচেয়ে বেশি দৃশ্যমান হয় বিদায়ী বছরটিতে। গেল বছরে মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে উদ্বোধন হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও ঢাকা-ময়মনসিংহ চার লেনের সড়ক এবং পায়রা সমুদ্র বন্দর প্রকল্প। ৩৮ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে পদ্মা বহুমুখী সেতু প্রকল্পের, ৫ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে মেট্রোরেলের, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয়েছে ৮২ ভাগ, পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দরের কাজ শেষ হয়েছে ৩৩ ভাগ।
এছাড়া উল্লেখযোগ্য অংশ কাজ শেষ হয়েছে রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি টার্মিনাল, মাতারবাড়ি বিদ্যুৎকেন্দ্র, পদ্মা সেতুতে রেল সংযোগ এবং দোহাজারী-রামু হয়ে কক্সবাজার থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্পের। নতুন মেগা প্রকল্প হিসেবে হাতে নেয়া হয়েছে যমুনায় রেলসেতু নির্মাণ।
বিদায়ী বছরে উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নে নজির সৃষ্টি করেছে সরকার। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) ৩৫টি বৈঠকে ২ লাখ ৭২ হাজার কোটি টাকার ২৭৮টি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে। পুরো অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় হয়েছে ৮৬ হাজার ৪৮২ কোটি টাকা। প্রকল্প সমাপ্ত হয়েছে ২৫৪টি। এডিপি বাস্তবায়ন হার দাঁড়িয়েছে ৯৩ শতাংশ।
গত বছরের জুলাই থেকে ডিসেম্বরের হিসাবে দেখা যায়, ছয় মাসে একনেকে ২ লাখ ৩০ হাজার ৬৪৪ কোটি টাকার ৮৬টি প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয়েছে যা গেল অর্থবছর বাদে যেকোন অর্থবছরের চেয়ে বেশি।
২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৯৯২ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেয়া হয় একনেকে। ওই অর্থবছরে উন্নয়ন ব্যয় হয়েছিল ৭১ হাজার ১৪১ কোটি টাকা। পুরো অর্থবছরে ২৮০টি প্রকল্প সমাপ্ত হয়। এডিপি বাস্তবায়ন হয়েছিল ৯১ শতাংশ।
২০১৩-১৪ অর্থবছরে একনেক ১ লাখ ২১ হাজার ৯৬২ কোটি টাকার ২১২টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছিল। উন্নয়ন ব্যয় হয়েছিল ৫৯ হাজার ৭৫৯ কোটি টাকা। এ সময় প্রকল্প সমাপ্ত হয়েছিল ২৩৬টি।
বিদায়ী বছরে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের চোখের সামনেই দ্রুত গতিতে দৃশ্যমান হয়েছে স্বপ্নের পদ্মা বহুমুখী সেতু। অথচ ঋণদাতা সংস্থাগুলো অর্থায়ন প্রত্যাহার করায় এই সেতুর স্বপ্ন বাদ দিয়েই দিয়েছিল ওই অঞ্চলের মানুষগুলো। তবে আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ়তা ও সাহসিকতার প্রতীক হিসেবে পদ্মার মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে পদ্মা সেতুর পিলারগুলো। বর্তমান কাজের গতিতে এখন ওই অঞ্চলের মানুষের সন্দেহ নেই যে, তারা ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের যে কোন দিন পদ্মা নদী সেতু দিয়ে পার হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে ২৯ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে সড়ক ও সেতু মন্ত্রণালয়। ৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘের সেতুটির জন্য চলতি অর্থবছরের বাজেটে বরাদ্দ আছে ৬ হাজার কোটি টাকা। এ পর্যন্ত সেতুটির কাজ শেষ হয়েছে ৩৮ ভাগ যার অর্ধেকের বেশি সম্পন্ন হয়েছে গেল বছরে।
গত ১৩ আগস্ট বাংলাদেশের তৃতীয় বাণিজ্যিক সমুদ্রবন্দর হিসেবে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে পায়রা। ওইদিন ঢাকায় গণভবনে বসে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে পটুয়াখালীর পায়রা বন্দরে বাণিজ্যিক জাহাজ থেকে পণ্য খালাস কার্যক্রম উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, নতুন এ বন্দর ঘিরে অর্থনৈতিক কর্মচাঞ্চল্য শুরু হবে। শুধু দক্ষিণাঞ্চল নয়, সমগ্র বাংলাদেশ, এমনকি দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের জন্যও এই বন্দর একটি শুভ সূচনা।
২০২৩ সালের মধ্যে এটিকে গভীর সমুদ্রবন্দরে রূপান্তরের জন্য কাজ করছে সরকার। পদ্মা সেতু নির্মাণের পর এই সমুদ্রবন্দরটি দক্ষিণ জনপদের অর্থনীতির চিত্র বদলে দেবে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
প্রকল্পটির আওতায় বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুর সমান্তরালে ৩০০ মিটার উজানে প্রায় ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার ডেডিকেটেড ডুয়েলগ্যাজ স্টিল, প্রায় তিন কিলোমিটার ভায়ডাক্ট নির্মাণের পাশাপাশি ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার রেলওয়ে এপ্রোচ নির্মাণ করা হবে।
২০১৬ সালটির অর্জন এখানেই শেষ নয়। এই বছরে হাতে নেয়া হয়েছে আরও বেশ কিছু বড় আকারের উন্নয়ন প্রকল্প। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম এক্সপ্রেসওয়ে। এটি নির্মিত হলে দেশের অতিগুরুত্বপূর্ণ দুই অংশের মধ্যে সহজ ও দ্রুত সড়ক যোগাযোগ স্থাপন সম্ভব হবে বলে আশা করেছেন সংশ্লিষ্টরা। এটি বাস্তবায়নে সম্ভাব্যতা যাচাই ও ডিটেইল্ড ডিজাইনের কাজ শেষ করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক। চারটি প্যাকেজে এই প্রকল্পের বাস্তবায়ন ব্যয় হবে ১৮ হাজার ৬৫৯ কোটি টাকা। প্যাকেজের বাইরে সেতু ও কালভার্টসহ অন্যান্য কার্যক্রম করতে আরও ১০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। ২০২২ সালের মধ্যে এটি নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পে সড়কের পাশাপাশি ওভারপাস ও আন্ডারপাস তৈরি করা হবে ১০৭টি, মেঘনা ও গোমতি সেতুসহ মোট ২৮টি সেতু, ১৬টি এলিভেটেড সেকশন তৈরি করা হবে।
এ ছাড়া রাজধানীর যানজট নিরসনে মেট্রোরেলের পাশাপাশি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে গেল বছরে। পিপিপির আওতায় প্রকল্পটির মূল ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৭০৩ কোটি টাকা।
গত বছর রেকর্ড পরিমাণ উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন করা হয়েছেউল্লেখ করে সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম বলেন, সরকার নজর দিয়েছে প্রকল্পে সঠিক ও গুণগত বাস্তবায়নের দিকে। কেননা ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য পূরণ করতে হলে আমাদের এটা করতেই হবে। তিনি বলেন, ২০১৬ সালে দেশে সবচেয়ে বেশি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে ও বাস্তবায়নের দিকে এগিয়েছে। এছাড়া কয়েকটি নতুন মেগা প্রকল্প গ্রহণ করাও হয়েছে। 
তাই বিদায়ী বছরটিকে অবশ্যই মেগা প্রকল্পের বছরবলা যায়।